বুধবার, ২২ মে ২০২৪, ০৭:৫৮ অপরাহ্ন

রাজশাহীতে সমবায় সমিতির লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ

  • প্রকাশ সময় সোমবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৪
  • ২৫ বার দেখা হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক:রাজশাহীতে একটি সমবায় সমিতির লাখ লাখ টাকা তছরূপ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবছর এই সমিতি শুধু ভাড়া বাবদই প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা আয় করে থাকে। কিন্তু বছরের পর বছর নিরীক্ষার সময় আয়ের হিসাব তুলে ধরা হয় কম। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখানো হয়, সমিতির আয়-ব্যয়ের টাকার অংক সমান। এ নিয়ে সমিতিরই একজন সদস্য আদালতে মামল করেছেন। বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা এ মামলায় কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ চার সদস্যকে আসামি করা হয়েছে।

এই সমিতিটির নাম রাজশাহী রিফিউজি কো-অপারেটিভ স’মিল লিমিটেড। এই সমিতির বয়স ৭১ বছর। ১৯৫২ সালে সমিতিটি নিবন্ধন পায়। এর নিবন্ধন নম্বর-২২। আইডি নম্বর ৮১২২০০৩৯১। এটি মূলত ভারত থেকে রাজশাহীতে আসাতৎকালীন মুহাজির বা রিফিউজি কাঠ মিল ব্যবসায়ীদের সমিতি। ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের জেলা প্রশাসক রাজশাহীন গরীর গোরহাঙ্গা এলাকায় প্রায় সাড়ে ১৪ কাঠা খাস জমি সমিতিটি কেইজারা দেয়। এখনও ওই ইজারা চলমান। রাজশাহী নিউমার্কে টসংলগ্ন এই জমিটি প্রধান সড়ক লাগোয়া। এটি এখন শহরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হয়ে উঠেছে।

এই জমিতেই কয়েকটি দোকান পাট ও কার্যালয় নির্মাণ করে রাজশাহী রিফিউজি কো-অপারেটিভ স’মিল লিমিটেড। প্রতিমাসে এসব দোকান পাট ও কার্যালয় থেকে ভাড়া ওঠে। সেইভাড়ার টাকাই তছরূপ করা হয় বলে অভিযোগ। এ নিয়ে গত ১৫ এপ্রিল সমিতির সহ-সভাপতি সোবহান বাদী হয়ে রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানার আমলী আদালতে একটি মামলা করেন। মামলায় সমিতির সভাপতি আবদুল জাব্বার আনসারী, সাধারণ সম্পাদক আসলাম পারভেজ, সদস্য সারফারাজ আব্বাস ও জুলেখা আব্বাসকে আসামি করা হয়েছে। এদেও মধ্যে আবদুল জাব্বার আনসারী ও আসলাম পারভেজ সম্পর্কে দুই ভাই। আরজু লেখা ও সারফারাজ হলেন সভাপতি জাব্বার আনসারীর সন্তান। ছয় সদস্যেও কমিটির মধ্যে এই পরিবারটিই চারটি পদ দখল কওে আছেন। আর তাদের বিরুদ্ধেই সমিতির বিপুল টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, শুধু ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ দুই অর্থ বছরেই মামলার আসামিরা দোকান ভাড়ার ১৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ও জামানতের ১২ লাখ ৯৪ হাজার ৯০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। মামলা অনুযায়ী, সমিতি জিয়াউল হক নামের এক ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে বছরে ৩৬ হাজার, খাজাবাবা নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ ২০ হাজার, একটি দোকান থেকে ৩ লাখ ৩৬ হাজার, একটি বিরিয়ানির দোকান থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার ও আরেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করে থাকে। প্রতি অর্থ বছওে সমিতি ভাড়া থেকেই ৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা আদায় করে থাকে।

এ টাকা সমিতির সভাপতি-সম্পাদকসহ অন্য দুইসদস্য ইচ্ছে মতো লুটপাট করা হয়। শুধু তাইনয়, সমিতির এই চার সদস্যই অনিয়ম কওে সমিতিতে তাদের শেয়ারের সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছেন। ২০২১-২২ অর্থ বছওে সভাপতি আনসারীর শেয়ারের সংখ্যা ছিল ৫৮০টি। ২০২২-২৩ অর্থ বছওে তা বাড়িয়ে ৪ হাজার ৬৮০টি করে নেওয়া হয়। একই ভাবে ছেলে সারফারাজ ও মেয়ে জুলেখার ১৩০টি করে শেয়ার ছিল। তা বাড়িয়ে বাড়িয়ে ১ হাজার ২৩০টি করে নেওয়া হয়েছে। জামাতা সাব্বির আহমেদের কোন শেয়ার ছিলনা। হঠাৎ কাগজে-কলমে তার শেয়ার ১ হাজার ২০০টি করে নেওয়া হয়। কীভাবে তাদের পরিবারের শেয়ার রাতারাতি বেড়ে গেছে তা সমিতির অন্য সদস্যরা কিছুই জানেন না। এক্ষেত্রে গঠনতন্ত্র ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয়নি বলে অভিযোগ সমিতির অন্য সদস্যদের।

সমিতির সদস্য আলমগীর বলেন, এই সমিতিতে মোট সদস্য আছেন ৪৫ জন। সমিতির আয় সদস্যদের কল্যাণে তাদের মাঝে বণ্টনের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি-সম্পাদক তা করেন না। সমিতির আয়-ব্যয় ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে করার নিয়ম থাকলেও সেটাও করা হয়না। তারা আয়-ব্যয়ের কোন হিসাবও কাউকে দেন না। ইচ্ছে মতো ব্যয় দেখিয়ে ২০১৪ সাল থেকে প্রতিবছর সমিতির লাখ লাখ টাকা তছরূপ করা হচ্ছে।’
অভিযোগের বিষয়ে সমিতির সভাপতি আবদুল জাব্বার আনসারী বলেন, ‘আত্মসাতের অভিযোগ সঠিক না। সহ-সভাপতি মামলা করেছেন তা ঠিক। কিন্তু সবকিছু তোতাকে নিয়েই করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের শেয়ার নিয়ম মেনে বাড়ানো হয়েছে বলেও দাবি তাঁর।
নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রতি অর্থ বছওে শুধু ভাড়া থেকেই সংগঠনটি থেকে ৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা আয় করে। কিন্তু সমবায় কর্মকর্তা যে নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন, তাতে এই আয় দেখানো হয়না। ২০২২-২৩ অর্থ বছওে সব মিলিয়ে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৩৪৩ টাকা আয় দেখানো হয়। আর খরচও দেখানো হয় ৪ লাখ ১৬ হাজার ৩৪৩ টাকা। সভাপতি-সম্পাদক স্বাক্ষরিত এই আয়-ব্যয় হিসাব বিবরণী অনুমোদন দেন নিরীক্ষা কর্মকর্তা ও রাজশাহী মেট্রোপলিটন থানা সমবায় কর্মকর্তা নাছিমা খাতুন। এর আগে ২০২১-২২ অর্থ বছরেও ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৬০৩ টাকা আয় এবং একই পরিমাণ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। এই নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও সমিতির সভাপতি-সম্পাদকের স্বাক্ষর করা হিসাব বিবরণী অনুমোদন দেন নিরীক্ষক ও মেট্রোপলিটন থানা সমবায় কার্যালয়ের সহকারী পরিদর্শক বিউটি রানী সাহা।

মামলার বাদী সোবহান বলেন, ‘সমবায় কর্মকর্তাকে “ম্যানেজ” কওে বছরের পর বছর নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। এভাবে সমিতির আয়-ব্যয় সমান দেখানো হয়। বাস্তবে ব্যয়ের চেয়ে আয় অনেক বেশি। এই টাকা সমিতির সভাপতি-সম্পাদকসহ কয়েক জন আত্মসাৎ করেন।’

জানতে চাইলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসলাম পারভেজ বলেন, ‘সব হিসাবই তো অডিট রিপোর্টে দেওয়া যায়না। বোঝেনই তো! নিজেদের মধ্যে বণ্টন করতে হয়।’বছর বছর আয়-ব্যয় সমান দেখিয়ে নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রস্তুতের ব্যাপাওে মেট্রোপলিটন থানা সমবায় কর্মকর্তা নাছিমা খাতুন বলেন, ‘সভাপতি-সম্পাদক যে হিসাব বিবরণী দেন, যাচাই-বাছাই করেই সেটা অনুমোদন দেওয়া হয়। এর বেশি কোন আয় হয়ে থাকে কিনা তা জানিনা।’

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ দেখুন
© All rights reserved © 2021 dailysuprovatrajshahi.com
Developed by: MUN IT-01737779710
Tuhin