রবিবার, ১৬ জুন ২০২৪, ০৬:২৪ অপরাহ্ন

রাজশাহী গোদাগাড়ীতে পুকুর সংস্কারের নামে চলছে পুকুর খনন প্রশাসনকে বোকা বানাচ্ছে অবৈধ পুকুর ব্যবসায়ীরা

  • প্রকাশ সময় সোমবার, ২০ মে, ২০২৪
  • ২৩ বার দেখা হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জমির প্রকৃতি পরিবর্তন করে পুকুর খনন করা হচ্ছে। গত দুই বছরে অবৈধভাবে ২৪৫টি পুকুর খনন করা হয়েছে। এতে আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে। পাশাপাশি পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। পুকুর খনন থামাতে প্রশাসন অভিযান ও জরিমানাতেই আটকে রয়েছে। জরিমানা পরিশোধের পর ফের খনন করা হচ্ছে পুকুর। পুকুর ব্যবসায়ীরা জোর বলছেন প্রশাসন ও আইন শৃংখলা বাহিনীকে ম্যানেজ করেই তারা পুকুর খনন করছেন। এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রশাসক শামিম আহমেদ গনমাধ্যমকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কেউ যদি তাঁর নাম করে পুকুর খনন করার কথা বলে থাকেন তবে সাথে সাথে স্থানীয় প্রশাসনকে অবগত করতে হবে। এক্ষেত্রে কাউকে কোন ছাড় দেয়া হবেনা।

রাজশাহী জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্যমতে, ২ বছর আগে গোদাগাড়ী উপজেলায় পুকুরের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৩৮ টি। বর্তমানে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২৮৩টিতে। অর্থাৎ দুই বছরে ২৪৫টি পুকুর খনন করা হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, এ সময়ের মধ্যে ৩ শতাধিক পুকুর খনন করা হয়েছে। খনন বন্ধে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ১১ বার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ১১টি মামলা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯ জনকে জরিমানা ও ১ জনকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এখন প্রশ্ন আসতেই পারে নতুন ২৪৫টি পুকুর কিভাবে অনুমতি পেল ? এর উত্তর না গনমাধ্যমের কাছে না আছে জেলা প্রশাসনের নিকট।

কিন্তু গেল গত ২০ এপ্রিল সরেজমিন গোদাগাড়ী উপজেলার কাঁকনহাট পৌরসভার চব্বিশনগরের ফুলতলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ৩টি স্কেভেটর (পুকুরখনন যন্ত্র) দেদারসে মাটি কেটে পুকুর খনন চলছে। সেই সাথে পুকুর খননের মাটি নেয়া হচ্ছে ৭ থেকে ৮ টি ড্যাম ট্রাকে। প্রায় ৮ মিনিটে একটি ট্রাক্টরে মাটি ভর্তি করা হচ্ছে। আর এই মাটি বিক্রি হচ্ছে এলাকার বিভিন্ন ইট ভাটায় । আরোও জানা যায়, পুকুরের মাটি বিক্রি হয় ২ শ্রেনীতে। এর মধ্যে প্রতি ট্রাক্টর মাটি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকায় এবং প্রতি ট্রাক মাটি বিক্রি হচ্ছে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকায়। এদিকে পুকুর খননের ফলে আদিবাসী ২০টি পরিবার পড়েছেন চরম দূর্ভোগে। তারা একের পর এক অভিযোগ জানিয়ে পাচ্ছেননা কোন সুফল।

তবে পুকুর খননের বিষয়ে পুকুর খননকারী বিষুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের কোন অনুমতি পত্র নেই তার নিকট। স্থানীয়দের ম্যানেজ করে পুকুর খনন করছেন তিনি।

অন্যদিকে রাজশাহী চাপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের পাশে আলিমগঞ্জ এলাকায় ন্যাশনাল পেট্রোল পাম্পের পাশে এমবিএন ইট ভাটার পেছনে ফসলী জমির মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে সিয়াম ইট ভাটায়। নিয়ম করে সকাল ৮ থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কৃষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে একটি প্রভাবশালী মহল কৃষকদের ফসলী জমির মাটি কেটেই চলেছে।

তবে উল্লেখ্য যে, পুকুর খনন ও মাটি কাটা ব্যবসার সাথে যারা জড়িত তারা বেছে নিয়েছেন অভিনব কৌশল। গোদাগাড়ীর পুকুর ব্যবসায়ী হাবিব জানান, প্রশাসন কখনই সরাসরি পুকুর খননের অনুমতি দেয় না। তারা ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। পুকুর খননের আগে খননের জায়গায় কিছুটা মাটি কেটে গর্ত তৈরি করেন তারা। এরপর সেখানে ৫/১০ বাড়ির ময়লা পানি জমা করে একটি ডোবা বা নালা তৈরি করে রেখে দেয়া হয়। এরপর ডোবা বা নালা তৈরি হওয়ার পর জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের নিকট সেটিকে ছোট পুকুর অভিহিত করে সংস্কার করার দরখাস্ত করেন। এরপর প্রশাসন সরেজমিন তদন্ত করতে আসলে আশেপাশের বাড়ির মানুষ ও নিজস্ব কিছু লোকদের ম্যানেজ করে প্রমান করাতে সক্ষম হন এটি একটি ছোট পুকুর। এরপর কোন সমস্যা ছাড়াই সেটি সংস্কারের অনুমতি পাওয়া মাত্র ১০ বিঘা হোক আর ২০ বিঘা তখন ইচ্ছেমত পুকুর খনন করেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে অসমতল জমি সমতল করা অনুমতি দেয় জেলা বা উপজেলা প্রশাসন। যা ভূমি আইনেও রয়েছে। সেই আলোকে ভালো ফসলী জমির মাটি বিক্রি করার পূর্বে ট্রাকটর চালিয়ে উঁচু নিচু করে অসমতল করা হয় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে পুরাতন ইটের বুজুরিও ফেলা হয় । এরপর ঐ জমির কৃষকের মাধ্যমে এসিল্যান্ড বরাবর জমি সমতল করার জন্যে আবেদন করা হলে জমি সমতল করার অনুমতি দেয়া মাত্রই শুরু হয় মাটি বিক্রির মহোৎসব।

তবে সার্বিক বিষয়ে রাজশাহী গোদাগাড়ী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) জাহিদ হাসান সাফ জানান গেল কয়েক মাসে পুকুর খননের বিষয়গুলো জানা মাত্রই সেখানে অভিযান চালানো হয়েছে। রাতের আঁধারেও অনেকেই পুকুর খননের চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু তিনি সরেজমিন অভিযান চালিয়ে সেগুলোও বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানান তিনি। ভ্রাম্যমান আদালতও পরিচালনা করছেন। তবে তিনি গোদাগাড়ীতে থাকা অবস্থায় কৃষি জমিতে কোনো ধরনের পুকুর খনন কিংবা ফসলী জমির মাটি বিক্রি করতে দেবেন না হুঁশিয়ারী দেন।

উল্লেখ্য কৃষিজমি সুরক্ষা আইন-২০১৬ (খসড়া)-এর ৪(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনোভাবেই কৃষি জমির ব্যবহার ভিত্তিক শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। আর ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১৩ আইনে কৃষিজমি, পাহাড় ও টিলার মাটি কেটে ইট তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো নিউজ দেখুন
© All rights reserved © 2021 dailysuprovatrajshahi.com
Developed by: MUN IT-01737779710
Tuhin