নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একরামুল হককে সংবাদ সম্মেলন ও মব সৃষ্টির মাধ্যমে বিতারিত করা অপচেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। শিশুতুল্য শিক্ষার্থী ও স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীদের ব্যবহার করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের জন্য প্রধান শিক্ষককে বলপ্রয়োগ করার অভিযোগ উঠেছে। সংবাদ সম্মেলনে আগত গণমাধ্যমকর্মীদের ছুড়ে দেয়া প্রশ্নের কারণে আয়োজকরা সাংবাদিকদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে মারতে তেড়ে আসেন।
সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, ‘স্কুলের কিছু শিক্ষার্থী ও স্থানীয় যুবকদের দিয়ে মব সৃষ্টির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকের অপসারণ কেনো চাচ্ছেন; বিষয়টির সমাধানকল্পে বিদ্যালয় কমিটি কর্তৃত আইনি প্রক্রিয়ায় কেনো অগ্রসর হচ্ছেননা’। আরো একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘ক্লাসরুম দখল করে শিক্ষাসেবা ব্যহত করে কেনো আপনারা বিদ্যালয়ের ভেতরেই সংবাদ সম্মেলন করছেন’। অন্য আরেকজন সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, ২০২২ সালে বিদ্যালয়ের ভেতরে কোচিং সংক্রান্ত বিযষয়াবলী নিয়ে তিনবছর পর কেনো অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করছেন।
সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে বিভ্রান্ত হয়ে আয়োজকরা গড়িমসি শুরু করেন। সাংবাদিকরা কেনো এতো প্রশ্ন করছেন সেটি নিয়েও তারা পাল্টা অভিযোগ তোলার সাথে সাথে ক্ষিপ্ত হয়ে অসদাচরণ করে তেড়ে আসেন সাংবাদিককে মারার জন্য! সংবাদ সম্মেলনের আয়োজকদের এমন আক্রমণাত্মক ও উগ্র আচরণে তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমকর্মীরা উক্ত সংবাদ সম্মেলন বয়কট করেন। উল্লেখ যে, বিদ্যালয়টির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্বে আছেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মোঃ হাবিবুর রহমান।
প্রধান শিক্ষকের অপসারণের দাবি সম্পর্কে দাপ্তরিকভাবে তিনি অবগত নন বলে জানান সভাপতি হাবিবুর রহমান। বিদ্যালয় ভবনের ক্লাসরুমে আয়োজিত সংবাদ সম্পর্কেও তিনি অবগত নন। শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের দিয়ে মবক্রেসির মাধ্যমে শিক্ষকের পদত্যাগের নিমিত্তে সংবাদ সম্মেলন ও জোড়পূর্বক অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষরের বিষয়টি নিয়ে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, এই ধরনের কর্মকান্ড আইনসম্মত নয়। এটা করা ঠিক হয়নি। আজ সন্ধ্যায় (০২ নভেম্বর) প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষককে ডেকে পাঠানো হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে উভয়ের সাথেই আমি কথা বলবো। উল্লেখ্য, একরামুল হক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে। তিনি কিছুটা আক্ষেপ করে বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাসেবার মান বৃদ্ধি না করে শিক্ষার্থীদের দিয়ে এইধরনের মবক্রেসি করানো কখনোই কাম্য নয়। এমনটা হলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছ থেকে পজিটিভ কিছু শিখতে পারবেনা।
প্রধান শিক্ষকের অপসারণের দাবি তুলে রোববার বেলা ১২ টায় স্কুলভবনের নিচতলার একটি ক্লালরুমে আয়োজন করা হয় সংবাদ সম্মেলন। শিক্ষক, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, কর্মচারী ও অভিভাবকদের ব্যানারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হলেও লক্ষ্যকরা যায়নি কোন অভিভাবকের উপস্থিতি। দু-একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী থাকলেও স্কুলের বাইরে ও ভেতরে ছিল পঁচিশ- ত্রিশজনের স্থানীয় ও বহিরাগতের একটি গ্রুপ। ছিল একটি রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন এলাকার দলীয় নেতাকর্মীদের একাংশও।
সংবাদ সম্মেলন আর হট্টগোলের কারনে রোববার ১১টার পর থেকে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলা পর্যন্ত কোন ক্লাস করতে পারেনি সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বেশকিছু অভিযোগ তুলে প্রধান শিক্ষকের অপসারণের দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের প্রস্থানের পর পুণরায় মব সৃষ্টির মাধ্যমে বেলা ১টার দিকে পদত্যাগ সংক্রান্ত একটি দলিলে জোড়পূর্বক স্বাক্ষর জন্য চাঁপ সৃষ্টি করার অভিযোগ উঠেছে।
সিনিয়র ধর্ম শিক্ষক তরিকুল ইসলাম ও সহকারী প্রধান শিক্ষক হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে মানববন্ধন ও মব সৃষ্টির কাহিনী ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ অধ্যক্ষসহ কর্মরত শিক্ষকদের একাংশের। জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক একরামুল হক আরো বলেন, আমাকে এখান থেকে সরানোর অসৎ অভিপ্রায় নিয়ে বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক পরিকল্পিতভাবে বহিরাগত যুবক ও বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে মব সৃষ্টির মাধ্যমে স্বেচ্ছায় আমার পদত্যাগ সংক্রান্ত একটি অঙ্গীকারনামায় জোড়পূর্বক স্বাক্ষর করতে বাধ্য করিয়েছে।
যদি অঙ্গীকারানুযায়ী আমি পদত্যাগ না করি তাহলে আমাকে টেনে হেঁচড়ে চেয়ার থেকে নামিয়ে দিবেন বলেও শাসিয়েছেন। তাদের মবক্রেসির কারণে বিদ্যালয়ের কর্মচারি ও শিক্ষকরা আমাকে সাহায্যের জন্য এগোতে পারেননি। তাদের বল প্রয়োগ ও অসদাচরণে আমি বাধ্য হয়ে আগামী ২৮-০২-২০২৬ তারিখের মধ্যে পদত্যাগ করে প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যাবো বলে অঙ্গীকার করতে বাধ্য হয়েছি।
সংঘবদ্ধ একটি চক্র ৫ আগস্টের পর থেকেই মাঝেমধ্যে এই ধরনের বেআইনি আচরণ করে আসছিল। গত কয়েকমাস আগেও আমার বিরুদ্ধে তারা বানানো একটি অভিযোগ দিয়েছিলেন জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে। ঐ অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটি বিষয়টির নিস্পত্তি করেন। রাজশাহী জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের (রাজস্ব শাখা) ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা শামস অভিযোগের তদন্ত করেছিলেন। সংঘবদ্ধ চক্রটি অভিযোগ দিয়েও কোন সুফল না পেয়ে আমার উপর ক্ষিপ্ত ছিলেন।
বিদ্যালয়টির ধর্ম শিক্ষার সিনিয়র শিক্ষক তরিকুল ইসলামকে প্যান্ট-শার্ট পড়ার বিপরীতে পাঞ্জাবী পড়ার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক একটি রেজুলেশন করা হয়েছিল। এতে তিনি কিছুটা ক্ষিপ্ত হন। এছাড়াও শিক্ষক তরিকুল নিজ বাসায় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে প্রাইভেট পড়াতেন। নিজ বাসায় প্রাইভেট পড়ানোর বিষয়ে আমি নিষেধ করলে তিনি আমার উপর আরোবেশি ক্ষিপ্ত হন।
এছাড়াও তিনি ছিলেন ক্রয় কমিটির একজন সদস্য। ক্রয় কমিটির স্বেচ্ছাচারিতা কমানোর কথা বলায় তারা আমার উপর রাগান্বিত হন। সহকারী প্রধান শিক্ষক হামিদুর রহমান ও তরিকুল ইসলাম পরিকল্পিতভাবে কিছু শিক্ষক ও শিক্ষর্থীদের ব্যবহার করে আমার উপর ক্ষিপ্ত করে তোলেন। প্রদান শিক্ষকের চেয়ারটি দখলের অসৎ অভিপ্রায় নিয়েই তারা এই ধরণের মবক্রেসির মাধ্যমে আমাকে এখান থেকে সরাতে চাচ্ছেন বলে দাবি প্রধান শিক্ষকের।