নিজস্ব প্রতিবেদক: বেসরাকরী উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস, বাংলাদেশ পুননির্মানে সেই স্বাধীনতার পর থেকে কাজ করে যাচ্ছে। ব্রীজ, কালভার্ট ও বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো তৈরী করে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জনগনের অনেক উপকার করেছিলো। সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলমান রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনেক প্রকল্প। এরমধ্যে একটি প্রকল্প হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব, অভিযোজন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ প্রকল্প। প্রকল্পটি পহেলা মার্চ ২০২১ সাল থেকে শুরু হয়েছে। শেষ হবে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৩। দাতা সংস্থা কারিতাস লুক্সেমবার্গ এর সহায়তায় রাজশাহীর তানোর উপজেলার বাধাইর ইউনিয়নের মোট পনেরটি গ্রামে এই প্রকল্পটি চলমান রয়েছে।
কারিতাস অফিস কর্তৃক জানা যায় প্রকল্পে মোট উপকারভোগরি সংখ্যা ৯০০টি পরিবার। এর মধ্যে ৫৯৪টি পরিবার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির এবং ৩০৬টি অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর পরিবার। মোট সদস্য ৩,৭৯৭ জন। এর মধ্যে পূরুষ ১,৯১৬ এবং নারী ১,৮৮১ জন। ক্ষুধার অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান অর্জন এবং টেকসই কৃষির প্রসার ঘটানই হচ্ছে এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য এবং প্রকল্প এলাকার পিছিয়ে পড়া সবচেয়ে বেশী ঝুঁকিপূর্ণ জনগণ বিশেষত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকার মান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং চরম দূর্যোগের সময়েও সমাজভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।
এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে প্রত্যাশিত ফলাফল গুলো হালো- প্রকল্পের ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের উপকারভোগীদের খামার ও খামারের বহির্র্ভুত উৎপাদন ও আয় দ্বিগুন করার মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির গুনগতমান বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকল্পের ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারের উপকারভোগীদের খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতি উন্নত হয়েছে এবং আগের অবস্থায় ফিরে আসার গুনাবলী অর্জনসহ মহামারী ও দূর্যোগের সাথে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজভিত্তিক সমমনা সংগঠন ও আদিবাসী প্রথাগত সংগঠনের সহায়তায় ক্ষুদ্র কৃষক সংগঠনের পরিচালনা পদ্ধতি ও অধিকার শক্তিশালী হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই ফলাফল ফেতে যে সব কার্যক্রম কার্যক্রম বাস্তাবায়ন করা হয়েছে তা হলো- জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের উপরে সচেতনসতা বৃদ্ধি। কৃষকদের হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দান। কৃষি বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি। কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান। সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের এবং স্থানীয় কৃষি ব্যবসাযীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন। স্থানীয় আদিবাসী সংগঠন ও অন্যান্য সংগঠনকে শক্তিশালীকরণ এবং কৃষি প্রযুক্তি ও উপকরণ বিষয়ক প্রদর্শনী ও মেলা।
প্রকল্প অফিস কর্তৃক জানা যায় তারা ৬৩২টি পবিারে ক্ষরা সহনশীল ফসলের বীজ যেমন-ধান, গম, সরিষা, মশুর ডাল, মুগডাল, মাসকালাই ও তীল, স্বল্প মেয়াদী ফসলের বীজ, তাপসহনশীল ফসলের বীজ এবং চাষাবাদ বাবদ নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করেছে। ৪৩০টি পরিবারে কম্পোস্ট ও কেচোঁ সার করার জন্য অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়। ৮১২ পি পরিবারে ২২ প্রকারের শাকসবজির বীজ, ৩১টি পরিবারে ফলের চারা যেমন আম, লেবু ও পেয়ারা ও ৯০০ পরিবারে পেপের চারা ও সজনার ডাল বিতরণ করা হয়েছে।
এছাড়াও ২৬৮টি পরিবারের ফসল আবাদের জমি নাইনা থাকায় তাদেরকে হাঁস-মুরগী, ছাগল-ভোড়া প্রদান করা হয়েছে। ৩১ টি পরিবারে পুকুর সংস্কারসহ পোনা মজুদে আর্থিক সহায়তা দেয়া হয়েছে। ৪২০টি পরিবারে ড্রিপ ইরিগেশন অর্থাৎ অল্প পানিতে সবজি চাষের লক্ষ্যে বোতলে পানি সেচের জন্য উপকরণ সহায়তা দেয়া হয়েছে। ১০৪টি পরিবারে গরুর প্রমাব ধরে প্রকিয়ার মাধ্যমে পোকামাকর দমনের লক্ষ্যে গোয়ালঘরের মেঝে পাকা করে হয়েছে। ১৮৫ টি জমির প্লটে জৈব সারের জন্য ধইঞ্চা বীজ বিতলন করা হয়। ২০০টি পরিবারে ২০০ বোতল ট্রাইকোডারমা বিতরণ করা হয়েছে।
গম ও ভুট্টা গভেষনা ইনস্টিটিউট থেকে তাপ সহনশীল গম চাষ ও সম্প্রসারণের ণক্ষে প্রকল্পের আওতায় ২৫ জন কৃষককে বারি ৩৩,বারি ৩১ জাতের ১৫০কেজি গম বীজ ও ১০,০০০ টাকা নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। সেইসাথে প্রকল্পের মাধ্যমে কভিড-১৯ এর সময় খাদ্য ও স্বাস্থ্য উপকরণ বাবদ পুষ্টি প্রকল্পের ১৫০জন দরিদ্র কৃষককে মোট ৩০৫,০০০ টাকা নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। এছাড়া পুষ্টি প্রকল্পের ১৫জন দরিদ্র কৃষককে মোট ১০৫,০০০ টাক পেশাগত নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে কৃষকদের মধ্যে অনেক প্রভাব পরেছে। প্রকল্প শুরুর আগে প্রকল্পের সুবিধাভোগিরা গতানুগতিকভাবে ফসল চাষ কওে তেমন লাভবান হতে পারছিলেন না। তাদের পরামর্শে বর্তমানে সকল পতিত জমি ও অন্যান্য জমিতি ভালভাবে ফসল চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। ফলে উপকারভোগিরা তাদের পরিবারের অনেক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছেন বলে জানান গেছে। এ বিষয়ে উপকারভোগি অঞ্জলী টুডু, চাপারানী, আকতারা বেগম ও ভূমিকা রানীসহ অন্যান্য কৃষক ও কৃষানীরা বলেন, এই প্রকল্পের কার্যক্রমসমূহ বরেন্দ্র এলাকার জন্য খুবই উপযোগী। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে তারা অনেক উপকৃত হয়েছেন।
তারা বলেন, মেয়াদী ফসল, খরা সহনশীল, তাপ সহনশীল ফসল চাষ সম্পর্কে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। জৈবসার ও কেঁচো সার তারা এখন জমিতে ব্যবহার করছেন। ফলে জমির পানি ধারন ক্ষমতা ও উর্ববরা শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। বসতভিটায় সবজি চাষ, বাড়ীতে হাঁস-মুরগী পালন করে যেমন একদিকে যেমন লাভবান হচ্ছেন তেমনি পুষ্টি গ্রহণের পরিমানও তাদের বৃদ্ধি পেয়েছে। সেইসাথে বাড়তি আয়ের পথ সৃষ্টি হওয়ায় তারা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেক সুখে বসবাস করছেন। আগামীতে আরো উন্নত প্রযুক্তি চাষাবাদ অন্যান্য কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষে এবং আরো দক্ষ হওয়ার প্রয়াসে প্রকল্পের মেয়াদ আরোও দুই বছর বাড়ানোর দাবী জানান উপকারভোগিরা।

প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে উপকারভোগিদের উপকার এবং প্রকল্পের কতটা সাফল্য এসেছে জানতে চাইলে কারিতাস বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার এ.এম. রইস উদ্দিন বলেন, বাস্তবায়িত প্রতিটি কার্যক্রমে উপকারভোগী ও সহযোগীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ায় প্রকল্পের কাজের গুনগতমান বৃদ্ধি পেয়েছে এবং স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিত হয়েছে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জনগণের প্রযুক্তিগত স্বচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দায়িত্ববোধ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে কৃষক দল, কারিতাস কর্মী, ব্রি, বারি, বিনা, গম-ভূট্টা গবেষনা প্রতিষ্ঠান, রাজাশাহী বিশ^বিদ্যালয় এবং সরকারী কর্মকর্তাগণ প্রকল্পের লক্ষ্য উদ্দেশ্য অর্জনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও দায়ীত্ব পালন করছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।