নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীতে চুরির অভিযোগ তুলে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বেধে নির্মম নির্যাতন করে শফিকুল ইসলাম জনি (৩৩) নামের এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। মামলা হলেও আসামিদের পুলিশ গ্রেপ্তার করছেনা বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনেরা বুধবার সকালে বিক্ষোভ মিছিল করেন। সেইসাথে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় ঘেরাও করে তারা সমাবেশও করেন। নিহত জনি নগরীর চন্ডিপুর এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে। তিনি নগরীর সাহেব বাজারের একটি কাপড়ের দোকানের কর্মচারী ছিলেন।
এই সমাবেশ থেকে নগরীর রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএসএম সিদ্দিকুর রহমানকে প্রত্যাহার করার দাবি জানানো হয়। বিক্ষোভ শেষে আসামিদের গ্রেপ্তার এবং হত্যা কাণ্ডের বিচার নিশ্চিতের দাবিতে জেলা প্রশাসক আবদুল জলিলকে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের আটক করছেন না।
গত ৫ জানুয়ারি দিবাগত মধ্যরাতে নগরীর চন্ডিমাতা কালিমাতার মন্দিরের সামনে জনিকে বৈদ্যুতিক খুঁটির সাথে বেধে নির্মম নির্যাতন করা হয়। রাত সাড়ে ১২টা থেকে ভোর রাত ৪টা পর্যন্ত থেমে থেমে নির্যাতন চলে শফিকুলের ওপর। যারা নির্যাতন করেন, পরে তারাই জনিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়ে তাকে বাড়ির সামনে ফেলে রেখে যান তারা। পরদিন শারীরীক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আবারও রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জনি মারা যান।
এ ঘটনায় জনির ভাই রিয়াজ সাইদ বিপ্লব বাদী থানায় মামলা করেন। আসামিরা হলেন- কাজিহাটা এলাকার তৌফিকুর রহমান বাবু (৫২), তাঁর ভাই শাহীন (৫৫), একই এলাকার কিশোর (২০) এবং প্রসেনজিৎ (২২)। এদের মধ্যে তৌফিকুর রহমান বাবু ও শাহীন রাজশাহীর মাওলা এ্যালিগ্রো নামের একটি ডেভলপার প্রতিষ্ঠানের মালিক। এলাকায় তারা প্রভাবশালী। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, পূর্ব শত্রুতার জের ধরে জনিকে হত্যা করা হয়েছে। কাপড়ের দোকানে কাজ শেষ করে জনির ফেরার অপেক্ষায় আসামিরা ওঁৎ পেতে ছিলেন।
ঘটনার চারদিন পার হলেও কোন আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় এলাকার কয়েকশো নারী-পুরুষ বুধবার সকালে চন্ডিপুর মহল্লা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি রাজপাড়া থানার সামনে দিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের কার্যালয় এবং রাজশাহীর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে দিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে যায়। এই বিক্ষোভ মিছিল থেকে তৌফিকুর রহমান ও শাহীনসহ অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে নানা শ্লোগান দেওয়া হয়। দাবি করা হয় দ্রুত সময়ের মধ্যে এদের গ্রেপ্তারের।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সমাবেশে বক্তব্য দেন- নিহত জনির মা হানুফা বেগম, স্ত্রী রুবাইয়া খাতুন টুকু, ভাই রিয়াজ সাইদ বিপ্লব, প্রতিবেশী মাইনুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন, হাসান, তোজাম্মেল হক, বরুন শেখ, খালেদা খাতুন রোজী প্রমুখ। জনির মাহানুফা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’ স্ত্রী রুবাইয়া খাতুন বলেন, ‘আমার ছোট ছোট দুই সন্তান এতিম হয়ে গেল। আমি এখন কোথায় যাব? কী করব? আমি আমার স্বামীর হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।
শুধু তাই নয় সমাবেশ থেকে রাজপাড়া থানার ওসিকে প্রত্যাহারের দাবিতেও নানা শ্লোগান দেওয়া হয়। সমাবেশে খালেদা খাতুন রোজী বলেন, ‘জনি খুব ভাল ছেলে ছিলো। পূর্ব শত্রুতার কারণে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এখন চুরির অপবাদ দেওয়া হচ্ছে। দেখেন, এলাকার শত শত মানুষ এখানে এসেছে। একজন চোরের জন্য কেউ আসতোনা। রাজপাড়ার থানার ওসি আসামি না ধরে বলে বেড়াচ্ছে, হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়েছে। ওসি টাকাওয়ালাদের কাছে ম্যানেজ হয়ে গেছে। আমরা ওসির প্রত্যাহার চাই। হত্যার সুষ্ঠু বিচারের জন্য তারা জোর দাবী জানান।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে মামলার আসামি তৌফিকুর রহমানের মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে। রাজপাড়া থানার ওসি এএসএম সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘হত্যা মামলা হয়েছে। তদন্ত চলছে। আসামিরাও গ্রেপ্তার হবে। পুলিশ কমিশনার সব কিছুই অবগত আছেন। আমরা আমাদের মতো কওে এগোচ্ছি। এলাকাবাসী বিক্ষোভ করতেই পারে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।