নিজস্ব প্রতিবেদক: “যেখানে অধিকার বঞ্চনা সেখানেই হুল” স্লোগানকে সামনে রেখে গোদাগাড়ী উপজেলায় ঐতিহাসিক সান্তাল হুল দিবস পালন করা হয়। রোববার সকালে উপজেলার রাজাবাড়ীহাট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গণে রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি ও সিসিবিভিও’র যৌথ আয়োজনে এবং রক্ষাগোলা সমন্বয় কমিটি ও গ্রাম সংগঠন সমূহের সহযোগিতায় বর্ণাঢ্য র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। র্যালি শেষে সিধু-কানুর প্রতিকৃতিতে পুস্পস্তক অর্পন করা হয়। পরে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
র্যালিটি রাজাবাড়ী হাট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গণ হতে বাজার প্রদক্ষিণ করে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন ও সান্তাল হুলের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালনা করা হয়। সভার সভাপতির সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে আলোচনা সভা শুরু করা হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সিসিবিভিও’র সভাপতি প্রফেসর আব্দুস সালাম। অনুষ্টানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিসিবিভিও’র সাধারণ সম্পাদক ও নির্বাহী প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা সারওয়ার-ই-কামাল। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক সোনার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ও রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমির নির্বাহী সদস্য আকবারুল হাসান মিল্লাত, রাজাবাড়ীহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মতিউর রহমান, রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কালচারাল একাডেমির সংগীত প্রশিক্ষক মানুয়েল সরেন, সিসিবিভিও’র সমন্বয়কারী আরিফ ইথার।
এছাড়াও রক্ষাগোলা সমন্বয় কমিটির সভাপতি সরল এক্কা, দিঘরী বাইসি প্রধান ও সুরশুনিপাড়া রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ সংগঠনের মাঞ্জি হাড়াম সিষ্টি বারে, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের গোদাগাড়ী শাখার সভাপতি কৃষ্ণ কুমার সরকার, গড়ডাইং রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ সংগঠনের নেত্রী কাথারিনা হাঁসদা ও শাহানাপাড়া রক্ষাগোলা গ্রাম সমাজ সংগঠনের নেত্রী ঝর্ণা লাকড়া উপস্থিত ছিলেন।
সভা সঞ্চালনা করেন সিসিবিভিও’র প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা সৌমিক ডুমরী ও সমাজ সংগঠক মানিক এক্কা। অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধায়ন করেন উর্দ্ধতন মাঠ কর্মকর্তা নিরাবুল ইসলাম ও সার্বিক সহযোগিতা করেন পরিবীক্ষণ ও আইটি কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিন ও সমাজ সংগঠকবৃন্দ।
অতিথিবৃন্দ তাদের বক্তব্যে বলেন, সাঁওতাল বিদ্রোহ বা সাঁতাল হুল হলো ১৯ শতকে ব্রিটিশ ভারতে সংঘটিত একটি ঔপনিবেশিক ও জমিদারি শাসন-বিরোধী আন্দোলন। যাতে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এর সূচনা হয় ১৮৫৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও বিহারের ভাগলপুর জেলায়। ইংরেজ আমলে স্থানীয় জমিদার, মহাজন ও ইংরেজদের রাজস্ব ও কৃষি নীতির বিরুদ্ধে সাঁওতালরা ঐক্যবদ্ধভাবে এই আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন চার ভাই- সিধু মুরমু, কান মুরমু ু, চাঁদ মুরমু ও ভৈরব মুরমু । ১৭৯৩ সালে বড়লাট (গভর্নর-জেনারেল) লর্ড কর্নওয়ালিশের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে তাঁদের প্রাচীন স্থানান্তর চাষ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। তাই ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের আগে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সাঁওতালরা বিদ্রোহ গড়ে তোলে।

তারা আরো বলেন, সাঁওতালদের দৃষ্টিতে, ১৮৫৫ সালে সাঁওতালরা সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিলেন তাঁদের অধিকার আদায়ের জন্য। তাঁরা এ যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন ইংরেজ, মহাজন ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিলো ব্রিটিশ সৈন্য ও তাঁদের দোসর ব্যবসায়ী, মুনাফাখোর ও মহাজনদের বিভিন্ন নিয়মনীতি থেকে নিজেদের রক্ষা করা এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা। সাঁতাল হুলের ইতিহাস হতে জানা যায়, দামিন-ই কোহ ছিলো সাঁওতালদের নিজস্ব অঞ্চল।
অতিথিবৃন্দ বলেন, ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন যুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে তা শেষ হয়। সাওতাঁলরা তীর-ধনুক ও দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করায় ইংরেজ বাহিনীর আধুনিক বন্দুক ও কামানের কাছে টিকতে পারে নি। এ যুদ্ধে ইংরেজ সৈন্যসহ প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল যোদ্ধা মারা গিয়েছিলেন। যুদ্ধে পর্যায়ক্রমে সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব (সাঁওতাল বিদ্রোহের প্রধান নেতাসমূহ) নিহত হলে ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে যুদ্ধ শেষ হয় ও বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটে।