নিজস্ব প্রতিবেদক:প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ. এম. এম. নাসির উদ্দিন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে পবিত্র রমজান মাস শুরুর আগেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা অনুযায়ী কমিশন পুরোদমে কাজ করছে জানিয়ে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে আশ্বস্ত করে বলেন, যে, নির্বাচন হবে কি হবে না, এ ধরনের বিতর্কে কান না দিয়ে কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে অবিচল রয়েছে। একইসাথে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও সহিংসতার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “যারা বাক্স দখল করে স্বপ্ন নিয়ে আছেন, তাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হবে।
ভোটকেন্দ্র দখলের ইতিহাস ভুলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা কঠোর অবস্থানে থাকবো। কোনো কেন্দ্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের সম্পূর্ণ ভোট বাতিল করা হবে বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন। শনিবার সকালে রাজশাহীর লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রাজশাহী অঞ্চলের নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন- রাজশাহী অঞ্চলের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন।
নির্বাচন কমিশনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে সিইসি বলেন, প্রধান উপদেষ্টার চিঠি পাওয়ার পর থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। তিনি জানান, ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ভোটের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনাকাটার প্রক্রিয়াও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। নির্বাচনী সীমানা নির্ধারণের খসড়া ইতোমধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে আগামী রোববার থেকে শুনানি শুরু হয়ে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে। এই শুনানির মাধ্যমে প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে সীমানা চূড়ান্ত করা হবে।
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে কমিশনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে সিইসি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, “স্ট্রাইকিং ফোর্স নয়, সেনাবাহিনী যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত হয়, সেই ব্যবস্থা আমরা নিয়েছি।” এর মাধ্যমে নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে একটি কার্যকরী ও আইনিভাবে শক্তিশালী ভূমিকার পথ সুগম করা হচ্ছে। ভোট যতই ঘনিয়ে আসবে, দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ততই উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যাক্ত করেন।
প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, অতীতে জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপার হিসেবে একই ধরনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের পুনরায় একই পদে পদায়নের কোনো চিন্তা কমিশনের নেই। অতিতের বিতর্কিত নির্বাচনের উদাহরণ টেনে সিইসি বলেন, বিগত নির্বাচনে যেসব কর্মকর্তা স্বপ্রণোদিত হয়ে অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাদের এবারের নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা হবে। নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব প্রায় পাঁচ হাজার সাতশ কর্মকর্তাকে দিয়েই কাজ চালানো হবে উল্লেখ করে তিনি স্বচ্ছতা নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেন। তিনি অস্ত্রবাজদের সতর্ক করে বলেন, “যারা অস্ত্রবাজি করে ভোটে জিততে চাইবেন তাদের জন্য দুঃসংবাদ আছে।”
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, সে বিষয়ে কমিশন কোনো পক্ষ নেবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন সিইসি। তিনি বলেন, “আনুপাতিক পদ্ধতি বা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন সংবিধানে নেই। এর বাইরে আমরা যেতে পারি না। এটা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলছে, আমি এর মধ্যে ঢুকতে চাই না। যদি আইন পরিবর্তন হয়, তাহলে হবে।”
সবশেষে নিজের ও কমিশনের নিরপেক্ষতার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, “এই সরকার নির্বাচন নিয়ে আমাকে এখন পর্যন্ত কোনো চাপ দেয়নি। আমাকে চাপ দিলে আমি পদত্যাগ করবো, চেয়ারে থাকবো না।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়াই নির্বাচন কমিশনের একমাত্র লক্ষ্য।