নিজস্ব প্রতিবেদক: “মৌমাছি প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সকলকে পুষ্ট করে” প্রতিপাদ্যে রাজশাহীর পবা উপজেলার বড়গাছীতে সবুজ সংহতি ও বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজিনাস নলেজ (বারসিক) এর আয়োজনে বিশ্ব মৌ-পতঙ্গ দিবস উৎযাপিত হয়েছে। মঙ্গলবার বেলা ১১টায় দাতা সংস্থা ডিয়াকনিয়া ও মিজারিওর সহযোগিতায় মৌ-পতঙ্গ সুরক্ষার দাবিতে কৃষকবন্ধন ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষ্যে এসময় প্লেকার্ড হাতে র্যালিতে অংশগ্রহন করে তাঁরা “পরিবেশবান্ধব কৃষি করি, মৌ-পতঙ্গ রক্ষা করি” সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
মৌমাছি কর্মচঞ্চল, চটপটে প্রকৃতির ছোট একটি পতঙ্গ দলবদ্ধভাবে বাস করে। শুধু কর্মঠই নয়, পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যও পতঙ্গটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতিতে যেখানে ফুল আছে, সেখানেই দেখা যায় প্রকৃতির বন্ধু মৌমাছি। পৃথিবীতে অনেক প্রজাতির মৌমাছি আছে। মৌমাছি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গের পরাগায়ণের ফলে গাছে ফুল ফোটে ও ফল ধরে এবং কৃষিজ ফসলের উৎপাদন উৎপাদন বাড়ায়। এছাড়াও মৌমাছির চাষ ও মধু সংগ্রহ করে অনেকে পেশা হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
মৌমাছিরা ফুলে ফুলে বিচরণ করে ফুলের রেণু ও মিষ্টি রস সংগ্রহ করে। সংগৃহীত পুষ্পরসই মধু তৈরির প্রধান উপকরণ। রস সংগ্রহের পর তা পাকস্থলীতে জমা রাখে। সংগৃহীত রসের সঙ্গে মৌমাছির মুখনিঃসৃত লালা মিশ্রিত হয়ে মধু তৈরি হয় এবং মৌচাকে জমা রাখে। ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ানোর সময় মৌমাছিরা তাদের পা এবং বুকের লোমে ফুলের অসংখ্য পরাগরেণু বয়ে বেড়ায়। এক ফুলের পরাগরেণু অন্য ফুলের গর্ভমুন্ডে পড়লে পরাগায়ন ঘটে তাতে উৎপন্ন হয় ফল। এভাবে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য ধরে রাখা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা ও উদ্ভিদের বংশবিস্তার এবং ফল ও শস্যদানা উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরাগায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কৃষকবন্ধন ও আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন, “উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক রাজশাহী অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী গবেষক শহিদুল ইসলাম। এসময় তিনি বলেন, মৌ-পতঙ্গ রক্ষায় নীতিমালা, আইন তৈরী করা হোক। একইসঙ্গে মৌমাছি বা মৌ-পতঙ্গ কেন্দ্র করে সরকারের যে আইন নীতিমালা আছে, প্রকৃতি-পরিবেশ আইনে মৌ-পতঙ্গ সুরক্ষার জন্য আলাদা সেকশন রাখতে হবে। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে মৌমাছি একটা গুরুত্বপূর্ন বিষয়। খাদ্য উৎপাদনে মৌ-পতঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক রাজশাহীর সহযোগী কর্মসুচী কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “কৃষিজমি ও বনভূমি হ্রাস, সচেতনতার অভাবে বিষাক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশক প্রয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে মৌ পতঙ্গ দিনে দিনে বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে। আবার মৌয়ালরা চাকে আগুন ও ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছি তাড়িয়ে মধু আহরণ করে তখন প্রচুর মৌমাছি ও ডিম পুড়ে যায়। ফলে মৌমাছির স্বাভাবিক প্রজননে ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে উপকারী এই পতঙ্গটিও পরিবেশ থেকে হারিয়ে যাবে। পৃথিবীতে মৌমাছিসহ অন্য যেসব পতঙ্গ পরাগায়নে ভূমিকা রাখছে, সেসব প্রাণীকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষায় জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে আরও বেশি আগ্রহী ও সে সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।”
হিসাব ব্যবস্থাপক উপেন রবিদাস বলেন, “মৌ-পতঙ্গ উপর আমাদের খাদ্য ব্যবস্থা নির্ভর করছে। মৌ-পতঙ্গ যদি না থাকে তাহলে খাদ্য উৎপাদনই হবে না। খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যে পরাগায়ন হয় তার মাহুতি হচ্ছে মৌ-পতঙ্গ। দেদারসে খাদ্য উৎপাদনে যে কীট ব্যবহার করছি। এই কীট ব্যবহারের কারণে মৌ-পতঙ্গ মারা যাচ্ছে ফলে খাদ্য শৃঙ্খল হুমকির মূখে যাচ্ছে। আমরা চায় যে খাদ্য ব্যবস্থা আছে এটা টিকে থাকুক কারণ মৌমাছি যদি না থাকে পরাগায়ন হবে না। পরাগায়ন না হলে খাদ্য ব্যবস্থা সেটা বিঘ্নিত হবে। খাদ্য ব্যবস্থা সেটা বিঘ্নিত হলে এ অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে। একটি ছোট প্রাণী তার যে অবদান আমাদের জীবনে। এই প্রাণী জগতকে আমাদের পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে এই মৌ-পতঙ্গগুলো রক্ষা করতে হবে। বিষের ব্যবহার কমুক, মৌ-পতঙ্গ যে অবাধ বিচরণ, তাদের পরিবেশ সেটা সুরক্ষিত হোক। মৌ-পতঙ্গ রক্ষায় সকলকে সচেতন হওযার আহ্বান জানান।”
সবুজ সংহতি পবা উপজেলার আহ্বায়ক রহিমা বেগম বলেন, “আগে বাগানে মধুর চাক দেখা যেত সেখান থেকে মধু সংগ্রহ করা হতো। এখন আর দেখা যায় না। এখন বানিজ্যিকভাবে বাগানে মধু চাষ হচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন ফুল থেকে মধু চাষ হচ্ছে। আসল মধু আমরা পাচ্ছি না। মৌমাছি সংরক্ষনে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
”বড়গাছী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মনিরা বেগম বলেন, “মৌমাছি থেকে যে মধু সংগ্রহ হয়, সে মধু খেয়ে অনেক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরী হয়।”
বড়গাছী কৃষক ঐক্য সংগঠনের সভাপতি আব্দুর জাব্বার বলেন, “মৌমাছি পরাগায়ন সৃষ্টি করে ক্ষেতে। কিন্তু একই ক্ষেতে মাছি মারার জন্য বিষ প্রয়োগ করা হচ্ছে। ফলে পরাগায়ন না থাকার কারণে ক্ষেতে আবাদ হচ্ছে না আবার মৌ-পতঙ্গ বিলুপ্ত হচ্ছে।”
বারনই লোকসাহিত্য পরিষদের সভাপতি জুয়েল আহমেদ বলেন, “মৌ-পতঙ্গসহ সকলের বেঁচে থাকার অধিকার আছে। তারা প্রকৃৃতির সৃষ্টি। যাদের উপর আমরা নির্ভরশীল, বেঁচে থাকা। তাদের কাছে আমরা ঋণী। অজ্ঞতার কারণে আমরা তাদের মেরে ফেলি। রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। একে অপরের উপর আমরা সবাই নির্ভরশীল। সবাই যেন ভাল থাকি। সবাইকে সচেতন হতে হবে।” এসময় সুমন আলী, সামসুদ্দিনসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।