নিজস্ব প্রতিবেদক: বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান ড. এম আসাদুজ্জামান ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না—— রাজিউন)। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় রাজশাহী উপশহরস্থ ভাড়া বাসায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তিনি কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। কয়েকদিন ধরে তার জ্বরও ছিল। স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। বৃহস্পতিবার রাতে তিনি শহরের একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন। শুক্রবার সকালে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তবে তার আগেই তিনি মারা যান।
তার দুই সন্তানই আমেরিকায় থাকেন। সন্তানেরা দেশে ফেরার পর তার নিজ গ্রাম গোদাগাড়ী উপজেলায় দাফন সম্পূর্ন হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয় । তবে দুপুর ২.৩০ টায় প্রথম জানাযা জানাযা অনুষ্ঠিত হয় বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে। জানাযায় উপস্থিত ছিলেন বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক, রাজশাহী মহানগর বিএনপি’র সাবেক সভাপতি ও রাসিক সাবেক মেয়র মোহাম্মাদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির ত্রান ও পুনর্বাসন বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও রাজশাহী মহানগর বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট শফিকুল হক মিলন, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক তরিকুল আলম(অতিরিক্ত সচিব), অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শামসুল হোদা, বিএমডিএ বোর্ড সদস্য সাইফুল ইসলাম হিরক, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. আবুল কাশেম, মরহুমের চাচাতো ভাই ফরহাদ, বিএনপি গোদাগাড়ী উপজেলার সিনিয়র সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার মাহফুজুর রহমান মিলন সহ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং স্থানীয় জনগণ।
ড. এম আসাদুজ্জামানের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কেল্লাবারুইপাড়া মহল্লার বাসিন্দা আট ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। তার বড় ভাই ড.এম এনামুল হক পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ছিলেন। আরেক ভাই প্রয়াত ব্যারিষ্টার আমিনুল হক বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী। আরেক ভাই মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন বিএনপি চেয়ারপারসনের সামরিক উপদেষ্টা ছিলেন। বর্তমানে তিনি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।
উল্লেখ্য গত বছর আওয়ামী সরকারের পতনের পর ড. এম আসাদুজ্জামানকে বিএমডিএর চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়ন করা হয়। ১৯৯২ সালে বিএমডিএ প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি একজন বহুমাত্রিক শিক্ষাজীবনের অধিকারী। তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইরিগেশন ও ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট-এ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৮৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। কৃষির উপর গভীর গবেষণার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে কৃষি বিজ্ঞানে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে তিনি বিশ্বখ্যাত হাভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে অ-লাভ জনক প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নির্বাহী শিক্ষা কোর্স সম্পন্ন করেন।
ড. আসাদুজ্জামান কর্মজীবন শুরু করেন একজন ইরিগেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে। তিনি ১৯৯২, ১৯৯৬ এবং ২০০২, ২০০৬ এই দুই মেয়াদে বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০০৭ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তারপরও থেমে থাকেননি তিনি। কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাংক, সিডা, ডিএফআইডি, ও এডিবি-এর পরামর্শক হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রকল্পে কাজ করেন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি অবদান রাখেন। ড. আসাদুজ্জামান ছিলেন একাধারে গবেষক, উদ্ভাবক ও প্রয়োগবাদী। তাঁর গবেষণার মূল ক্ষেত্র ছিল ভূগর্ভস্থ পানি, টিউবওয়েল ডিজাইন, সেচ ব্যবস্থাপনা ও খরচ পুনরুদ্ধার। তিনি উদ্ভাবন করেন ইনভার্টেড ওয়েল নামক এক বিশেষ ধরনের টিউবওয়েল প্রযুক্তি, যা অতি পাতলা অ্যাকুইফার অঞ্চলেও সফলভাবে পানি উত্তোলনে সক্ষম।
তাঁর আরেকটি যুগান্তকারী উদ্যোগ ছিল প্রিপেইড মিটার ও স্মার্ট কার্ডভিত্তিক সেচ খরচ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা চালু করা, যা বাংলাদেশের সেচ খাতে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এতে কৃষক স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে সেচ সুবিধা পেতে শুরু করে। তাঁর নেতৃত্বে বরেন্দ্র অঞ্চলে বাস্তবায়িত প্রকল্পসমূহ কৃষি বিপ্লবের সূচনা করে। মরুপ্রায় বরেন্দ্র অঞ্চল আজ শস্যসমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করেছে, যা বরেন্দ্র মডেল নামে খ্যাত। এই মডেলটি এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক তা নেপাল ও ভারতের মতো দেশও প্রয়োগের কথা ভাবছে। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরুপ তিনি জাতীয় ও আন্তুর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক সম্মাননা লাভ করেন। তাঁর অবদান দেশের জন্য এক স্থায়ী সম্পদ হয়ে থাকবে।
বিএমডিএ’র শোক
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান ড. এম আসাদুজ্জামান এর মৃত্যুতে গভীর শোক ও শোকায়িত পরিবারের প্রতি সমবেদা জানিয়েছে বিএমডিএ পরিবার। সেইসাথে তাদের পক্ষ থেকে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়। তার এই মৃত্যুতে বিএমডিএ পরিবার গভীরভাবে শোকাহত বলে জানানো হয়।
বিএমডিএ বোর্ড মেম্বর সাইফুল ইসলাম হীরকের শোক
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) চেয়ারম্যান ড. এম আসাদুজ্জামানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বিএমএডি’র বোর্ড মেম্বর সাইফুল ইসলাম হীরক। শুক্রবার এক শোক বার্তায় তিনি বলেন, “ড. এম আসাদুজ্জামান একজন সৎ, দক্ষ ও উদ্ভাবনী চিন্তাধারার প্রশাসক ছিলেন। তাঁর সৃষ্টিশীলতা, সততা ও কর্মনিষ্ঠা আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে বরেন্দ্র অঞ্চলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অপূরণীয় ক্ষতি হলো। কেননা, এতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তিনি তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
রাজশাহী মহানগর বিএনপির শোক
শুক্রবার বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আলহাজ্ব আমিনুল হক এর আপন ভাই ড. এম আসাদুজ্জামান শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় রাজশাহী উপশহরস্থ ভাড়া বাসায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে রাজশাহী মহানগর বিএনপি’র পক্ষ থেকে আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট এরশাদ আলী ঈশা, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নজরুল হুদা ও সদস্য সচিব মামুন-অর-রশিদ মামুনসহ অত্র কমিটির সকল যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সদস্যগণ মরহুমের আত্মার মাগফিরাত এবং শোকায়িত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
রাজশাহী জেলা বিএনপির শোক
শুক্রবার বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার আলহাজ্ব আমিনুল হক এর আপন ভাই ড. এম আসাদুজ্জামান শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় রাজশাহী উপশহরস্থ ভাড়া বাসায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে রাজশাহী জেলা বিএনপি’র পক্ষে রাজশাহী জেলা বিএনপি আহ্বায়ক আবু সাইদ চাঁদ, যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম মার্শাল ও সদস্য সচিব বিশ্বনাথ সরকারসহ অন্যান্য সদস্যরা গভীর শোক ও মরহুমের আত্মার মাগফিরাত এবং শোকায়িত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। মহান আল্লাহ পাক তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন, আমিন।
নেতৃবৃন্দরা বলেন, তিনি বিগত বিএনপি সরকারের শাসনামলে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিচালক পদ লাভ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। পরবর্তীতে তিনি আবারও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। তাছাড়া ও তিনি অনেক সামাজিক কাজ করেন।