নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর পবা উপজেলার বামনশিকড় এলাকায় একই ঘর থেকে একই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী ও তাদের দুই সন্তানের লাশ উদ্ধার করা হয়। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতের কোনো একসময় তাদের মৃত্যু হয়। শুক্রবার সকাল সাড়ে৮টার দিকে বিষয়টি জানাজানি হয়। মৃতরা হলেন- মিনারুল ইসলাম (৩০), তার স্ত্রী মনিরা খাতুন (২৮), ছেলে মাহিম (১৩) ও মেয়ে মিথিলা (২)। তাদের বাড়ি পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বামনশিকড় গ্রামে।
বামনশিকড় পবা উপজেলায় হলেও এলাকাটি পড়েছে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মতিহার থানায়। মতিহার থানা-পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। এর আগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) আলামত সংগ্রহ করে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে স্ত্রী-সন্তানদের পর্যায়ক্রমে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর মিনারুল নিজে আত্মহত্যা করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তকালে তাদের বাড়ি থেকে একটি চিরকুটও উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ ধারণা করছে, চিরকুটটি মিনারুলের লেখা। চিরকুটে ঋণের দায়ে ও খাওয়ার অভাবে স্ত্রী ও সন্তাদের হত্যার পর আত্মহত্যার কথা লেখা আছে।

চিঠিতে লেখা হয়, আমি পিয়ারুল যেসব লেখা লেখব, সব আমার নিজের কথা। লিখে যাচ্ছি এই কারণে আমরা চারজন আজ রাতে মারা যাবো। এই মরার জন্য কারো দোষ নাই। কারণ লেখে না গেলে বাংলার পুলিশ কাকে না কাকে ফাসা টাকা খাবে। আমি মিনারুল প্রথমে আমার বোকে মেরেছি। তারপর আমার মাহিমকে মেরেছি। তারপর আমার মিথিলাকে মেরেছি। তারপর আমি নিজে গলাতে ফাঁস দিয়ে মরেছি। আমাদের ৪ জনের মরা মুখ যেন বাপের বড় ছেলে ও তার বো বাচ্চা না দেখে এবং বাপের বড় ছেলে যেন জানাজায় না যায়। আমাদের ৪ জনকে কাপন দিয়ে ঢাকতে আমার বাবা টাকা যেন না দেয়। এটা আমার কসম। ইতি মিনারুল, আসসালামু আলাইকুম।
অপর একটি চিঠিতে লেখা রয়েছে, আমি নিজ হাতে সবাকে মারলাম। এই কারণে যে আমি একা যদি মরে যাই,আমার বো, ছেলে, মেয়ে কার আশায় বেঁচে থাকবে। আমরা মরে গেল ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে। এত কষ্ট আর মেনে নিতে পারছিনা। তাই আমাদের বেঁচে থাকার চেয়ে মরে গেলাম সেই ভালো হলো। কারো কাছে কিছু চাইতে হবে না। আমার জন্য কাউকে মানুষের কাছে ছোট হতে হবে না। আমার বাবা আমার জন্য লোকের কাছে ছোট হয়েছে। আর হতে হবে না। চিরদিনের জন্য চলে গেলাম। আমি চাই সবাই ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ। এই দুটি চিঠি লাশের পাশে পাওয়া গেছে।ধন্যবাদ।”

সকালে খবর পেয়ে রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান ঘটনাস্থলে যান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্ত্রী এবং মেয়েকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে তাঁদের নিকট প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে। ছেলেকেও শ্বাসরোধ করে হত্যার মতো মনে হচ্ছে। মিনারুল আত্মহত্যা করেছেন বলে মনে হচ্ছে। আরও তদন্তের পর প্রকৃত কারণটা জানতে পারবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।’
তিনি বলেন, ‘লাশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হবে। কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে সেটা ময়নাতদন্তের পরই নিশ্চিত করে বলা যাবে। আত্মীয়-স্বজনেরা পুলিশকে বলেছেন, চিরকুটের লেখাটা মিনারুলেরই। সেখানে আর্থিক সমস্যার কথা উঠে এসেছে। তাঁরা বিষয়গুলো তদন্ত করবেন।

এই ঘটনায় পুরো এলাকা স্তব্ধ হযে গেছে। মিনারুলের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। মিনারুলের বাবা রুস্তম আলী নির্বাক হয়ে গেছেন। এছাড়াও মিনারুলের শাশুরী শিউলী বেগম শোকে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। সেইসাথে লাশের কোন ময়না তদন্ত তারা চাচ্ছিালেন না। বাড়ির ভিতরে থাকা মিনারুলের শাশুরীসহ একাধিক আত্মীয় স্বজনরা বলছিলেন মিনারুল ভাল ছেলে ছিলেন। মিনারুলের এবং তার পবিারের প্রতি কোন ক্ষোভ তাদের নেই। তারা কোন মামলা মোকদ্দমায় যাবেন না। সবগুলো লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই তারা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছিলেন। তারা আরো বলেন, ময়নাতদন্তে অনেক ঝামেলা। এজন্য ময়না তদন্ত ছাড়াই সকল লাশ দাফনের দাবী জানাচ্ছিলেন। কিন্তু আইনশৃংখলাবাহিনী চলে নিয়মের মধ্যে । তাদের মরার সঠিক তথ্য উদঘাটন করতে লাশের ময়না তদন্ত করা প্রয়োজন।