নিজস্ব প্রতিবেদক: ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন রাজশাহীর আসন্ন নির্বাচনে দুই শতাধিক অ-অনুমোদিত সদস্যদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত দেখিয়ে বর্তমান মেয়াদের ক্ষমতাসীন কমিটির পক্ষে নির্বাচনে জয়লাভ করার প্রচেষ্টা চালানোর সুস্পষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে। সুদীর্ঘ ৩৭ বছরের এই সেবামুলক প্রতিষ্ঠানটিতে এবারেই প্রথম বারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আগামী ২৯ অক্টোবর শুক্রবার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে এবং গত ২০ অক্টোবর এই নির্বাচনে দুইটি প্যানেল তাদের মনোনয়ন জমা দিলে সবকটি মনোনয়ন বৈধ বলে বিবেচিত হয়েছে।
ন্যাশনাল হাট ফাউন্ডেশনের এখনকার প্রচলিত গঠন্তন্ত্রের ধারা -৪ অনুযায়ী এই সংগঠনের সদস্য পদ লাভের বিষয়টি সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা আছে। এই ধারায় বলা হয়েছে ” সংগঠনের সদস্য পদ নিতে হলে আবেদনকারীর আবেদনটি নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদন লাভের পরই তিনি কেবল সদস্যপদ লাভ করতে পারবেন”। কিন্তু প্রায় দুই শতাধিক সদস্যর আবেদন নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদন না করেই বর্তমান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিধি বহির্ভত ভাবে সদস্য পদ প্রদান দেখিয়ে চুড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রনয়ণ করেছে বলে জানা গেছে।
এমনকি গত ২৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত শেষ সভায় খসড়া ভোটার তালিকাও অনুমোদন করা হয়নি। তথ্য প্রমানে দেখা গেছে ২০১৮ সালের ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত নির্বাহী কমিটির চতুর্থ সভায় “গঠনতন্ত্র সংশোধনীর জন্য গঠিত উপ-কমিটির সুপারিশ না পাওয়া পর্যন্ত নতুন আজীবন সদস্য ভুক্তি স্থগিত থাকবে। উল্লেখ্য যে আজীবন সদস্যগণই এই সংগঠনের ভোটার হিসেবে বিবেচিত হবেন।
২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিলো এবং তখন আজীবন সদস্য সংখ্যা ছিলো ৫৬৪ জন। তবে ভোটার তালিকায় এর সংখ্যা ৪৮০জন। কারন যারা ইন্তেকাল করেছেন তাদেরকে ভোটার তালিকায় সংগত কারণে বাদ রাখা হয়। গঠনতন্ত্র মোতাবেক এই কমিটির মেয়াদ তিন বছর।
বর্তমান মেয়াদের কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ২০১৭ সালের ৩ নভেম্বর। সে হিসেব অনুযায়ী গত ২ নভেম্বর ২০২০ তারিখে এই কমিটির মেয়াদ শেষ হবার কথা থাকলেও অতিমারি করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে গঠনতন্ত্রের ধারা মোতাবেক গত ২১নভেম্বর ২০২০ তারিখে নির্বাহী কমিটির ৭ম সভায় আরও ছয়মাস মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় ন্যাশনাল হাট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ তথা কেন্দ্রীয় কমিটি আরও ছয় মাস কমিটির মেয়াদ বৃদ্ধি করে তা আগামী ৩ নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

চলমান নির্বাহী কমিটির চার বছর মেয়াদ কালে মোট ৯ টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর প্রথম চারটি সভায় নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আলোচ্যসুচি প্রনয়ণ করা হয় এবং উক্ত চারটি সভায় মোট ১০৭ জন সদস্যভুক্তির জন্য করা আবেদন অনুমোদন করা হয়েছিলো। সে মোতাবেক সবশেষ অন্তর্ভুক্তি ধরলে মোট আজীবন সদস্য ভুক্তির সংখ্যা ৬৭১ জনে দাঁড়ায়। কিন্তু গত ১৬ অক্টোবর ২০২১ তারিখে নির্বাচন কমিশন এর টানানো চুড়ান্ত ভোটার তালিকায় সদস্য সংখ্যা দেখানো হয়েছে ৮৯০ জন ফলে এটি সুস্পষ্ট ভাবে প্রমানিত যে ৮৯০-৬৭১= ২১৯ জন সদস্যর সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত গঠনতন্ত্র মোতাবেক বিধি সম্মত হয়নি যাদের উপর ভর করেই এখনকার ক্ষমতাসীন কমিটির সভাপতি প্রফেসর ডাঃ নজরুল ইসলাম নির্বাচনী বৈতরনী পার হতে চাইছেন। আলোচ্য মোট নয়টি সভার মধ্যে শেষের ৫টি সভায় নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত বিষয়টি নিয়ে কোন এজেন্ডা বা আলোচ্যসুচী ছিলোনা ফলে নির্বাচন কমিশন যে চুড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রনয়ণ করেছে তার মধ্যে ২১৯ জন সদস্য গঠনতন্ত্র’র ৪নং ধারা মোতাবেক অনুমোদন করা হয়নি। ফলে এই ২১৯ জন ভোটারই ভুয়া হিসেবে পরিগনিত হবে।
গঠনতন্ত্র মোতাবেক প্রকৃত আজীবন সদস্য সংখ্যা ৬১৭ জন এবং ৬১৮ থেকে ৮৯০ জন সদস্যই অনুমোদনহীন অথচ এই অনুমোদনহীন সদস্যদের মধ্যে আজীবন সদস্য নং ৭১৮ এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।যেহেতু গত চতুর্থ সভার পর থেকে অনুষ্ঠিত পরবর্তী ৫টি সভায় নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার কোন এজেন্ডা ছিলোনা সেক্ষেত্রে সেই সময়ের বাইরে যাদের সদস্যভুক্তি দেখানো হয়েছে তারা নির্বাচনে প্রার্থী কিম্বা ভোটার হতে পারবেন না বলে মন্তব্য করেছেন রাজশাহী হাট ফাউন্ডেশনের একজন আজীবন সদস্য। এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চলমান নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য পুরো ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন যে তিনি সবকটি সভায় উপস্থিত থেকেছেন এবং চতুর্থ সভার পর কোন সভায় নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার কোন এজেন্ডা ছিলোনা এবং নতুনভাবে কোন সদস্যপদ লাভের জন্য কারো আবেদন অনুমোদন দেয়া হয়নি।
উল্লেখ করা যেতে পারে যে গত ১৩ জুলাই ২০১৮ তারিখের চতুর্থ সভায় গঠনতন্ত্র সংশোধন করার যে উপকমিটির কথা বলা হয়েছিলো সেই উপকমিটির প্রনয়ণ করা সংশোধিত গঠনতন্ত্র গত ২২ অক্টোবর ২০২১ তারিখের সাধারণ সভায় অনুমোদন লাভ করেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে এই সাধারণ সভায় ফাউন্ডেশনের কোষাধ্যক্ষ বিগত চার বছরের আর্থিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছিলেন। তাতে তিনি ২০১৭-২০১৮ বছরে আজীবন সদস্য খাতে আয় দেখিয়েছেন মোট ২,৯১,২০০/- যা মোট ৫৬ জন আজীবন সদস্যর কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে।
ফলে গত ৩০ জুন ২০১৮ তারিখ পযন্ত মোট আজীবন সদস্য সংখ্যা হবে ৫৬৪+৫৬=৬২০ জন। পরের বছর মানে ২০১৮-২০১৯ বছরে আয় দেখানো হয়েছে ৩,৫৮,৮০০/- টাকা যা ৬৯ জন আজীবন সদস্যর নিকট থেকে আদায় করা হয়েছে। এর পরের বছর তথা ২০১৯-২০২০ বছর বা ৩০ জুন ২০২০ তারিখ পর্যন্ত আজীবন সদস্য খাতে আয় দেখানো হয়েছে ৩৬,৪০০/- টাকা যা ৭ জন আজীবন সদস্যর কাছ থেকে নেয়া হয়েছে। পরের বছরে ২০২০-২০২১ এ এই খাতে কোন আয় দেখানো হয়নি অর্থাত ২০১৭ সালে এই কমিটি দায়িত্ব গ্রহণের পর মোট ৫৬+৬৯+৭=১৩২ জন আজীবন সদস্যর অনুমোদন দেয়া হয়েছে ফলে কোষাধ্যক্ষর প্রতিবেদন অনুযায়ী মোট সদস্য সংখ্যা হবে ৫৬৪+১৩২= ৬৯৬ জন হওয়া উচিত। কিন্তু নির্বাচন কমিশন চুড়ান্ত ভোটার তালিকায় আজীবন সদস্য সংখ্যা দেখিয়েছে ৮৯০ জন। ফলে সম্পুর্ন অসত উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ৮৯০-৬৯৬= ১৯৪ জন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে। কিন্তু ঘটনা অন্যখানে দেখা দিয়েছে।
গত ১৩ জুলাই ২০১৮ তারিখে অনুষ্ঠিত নির্বাহী কমিটির চতুর্থ সভায় গঠনতন্ত্র সংশোধন উপ কমিটির সুপারিশ না পাওয়া পর্যন্ত যে কোন ধরনের সদস্য অন্তর্ভুক্ত স্থগিত রাখা হয়েছিলো ফলে প্রকৃত ভাবে ৩০ জুন ২০১৮ তারিখ পর্যন্ত মোট সদস্য সংখ্যা হবে ৬২০ জন। ফলে ৮৯০-৬২০= ২৭০ জন সদস্য অনুমোদনহীন হওয়ায় ৬২১ থেকে ৮৯০ পর্যন্ত সদস্যগন অবশ্যই “ভুয়া” ভোটার হিসেবে পরিগনিত হবে বলে দাবি করছে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী একাধিক প্রার্থী ও সধারণ সদস্যগণ।
এ বিষয় জানতে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন রাজশাহীর পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ডাক্তার প্রফেসর নজরুল ইসলামকে কল করলে তিনি কল রিসিভ না করে তাৎক্ষনিক কেটে দেন। পরে অত্র কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার রওশন আলীর নকিট মোবাইলে কল করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজশাহী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একজন ম্যাজিষ্ট্রেটকে দিয়ে এই ভোটার তালিকা করা হয়েছে। এই ভোটার তালিকা নিয়ে কারো কোন প্রকার আপত্তি আছে কিনা সে বিষয়ে জানতে দুইদিন সময় দিয়ে রাজশাহীর একটি স্থানীয় পত্রিকায় খবর প্রকাশিত করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কেউ কোন প্রকার আপত্তি করেন নি। সামনে নির্বাচন। এই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং জলঘোলা করে ফায়দা হাসিল করার লক্ষে একটি মহল এই অপপ্রচার করছে।
তিনি বলেন, প্রকাশিক ভোটার তালিকায় কোন ভূয়া ভোটার নাই। সকল ভোটারের বিপরিতে শক্ত কাগজপত্র রয়েছে। যারা এই ধরনের তথ্য দিচ্ছে, তারা সম্পূর্ণ ভূল ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত তথ্য দিয়েছে বলে জানান তিনি।