নিজস্ব প্রতিবেদক: সূর্যমূখী ফুল একটি তেল জাতীয় শস্য। এই তেলের গুণমান অনেক। এছাড়াও এই শস্য চাষ করে অনেক কৃষক লাভবান হচ্ছে। কারন এই ফসল চাষ করতে সেচ, সার ও কিটনাশক কম লাগে। এছাড়াও জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পায়। সেইসাথে অনেকাংশেই ঝড় বৃষ্টি সহনশীল হওয়ায় ক্ষতির পরিমান কম হয়। রাজশাহীর পবা উপজেলার দুয়ারী মাঠে আব্দুল হালিম তার নিজ জমিতে সূর্যমুখি ফুলের চাষ করেছেন। তিনি গত রোপন করার জন্য জমি তৈরী করলেও কৃষি উপসহকারী অফিসার আশরাফুল ইসলামের পরামর্শে সূর্যমুখি ফুলের চাষ করেছেন।
এ বিষয়ে কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, তিনি এই প্রথম সূর্যমুখি ফুলের চাষ করেছেন। তবে বিভিন্ন কৃষকের নিকট তিনি এই ফুল চাষ সম্পর্কে শোনেন এবং তার ব্লকের কৃষি উপসহকারী উদ্বুদ্ধ করলে তিনি এবার এই ফুলের চাষ করেছেন। জমিতে খুব ভাল আবাদ হয়েছে। প্রাকৃতিক বড় ধরনের কোন দূর্যোগ না হলে এই সুর্যমুখি থেকে ভাল অর্থ উপার্জন করতে পারবেন বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন, বিঘা প্রতি এক কেজি বীজ লাগে। প্রতি বিঘাতে মাত্র ৩৫০০-৪০০০টাকা খরচ হয়। প্রতি বিঘাতে ৭-৮মন বীজ হয়। আর এক মন বীজের দাম বাজারে ৫০০০-৫৫০০ টাকা করে। সেক্ষেত্রে এই ফসল হতে এক বিঘা থেকে ৩৫,০০০-৪০,০০০টাকার ফসল ঘরে তোলা সম্ভব। আর এ থেকে প্রায় ৩৫০০০টাকা লাভ করা যাবে বলে জানান হালিম। এ বছরে ভাল হলে আগামীতে আরো বেশী জমিতে এই ফুলে চাষ করবেন বলে জানান তিনি। চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, বেড পদ্ধতি করে চাষ করলে বৃষ্টি হলেও পানি গাছের গোড়ায় জমতে পারেনা। নালা দিয়ে বেড় হয়ে যায়। ফলে গাছের কোন ক্ষতি হয়না।
সূর্যমুখি ফসল সম্পর্কে নওহাটা ব্লকের কৃষি উপশহকারী আশরাফুল ইসলাম বলেন, এই ফুলের গাছের উচ্চতা ১২৫-১৪০ সে.মি. ও পরিপক্ক পুষ্পমঞ্জুরী বা মাথার ব্যাস ১৫-১৮ সে.মি. হয়ে থাকে। আর প্রতি মাথায় বীজের সংখ্যা ৩৫০-৪৫০ টি হয়। বীজের তেলের পরিমাণ শতকরা ৪২-৪৪ ভাগ। এই ফসল রোপন থেকে ঘরে তুলতে রবি মৌমুমে ৯৫-১০০ দিন এবং খরিফ মৌসুমে ৮৫-৯০ দিন সময় লাগে। রবি মৌসুমে : অগ্রহায়ন মাস (মধ্য নভেম্বর – মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত) খরিফ-২ : ভাদ্র মাস (মধ্য আগষ্ট – মধ্য সেপ্টেম্বর) এর বপন করতে হয়। শতকরা ৮০-৯০ ভাগ বীজ পরিপক্ক হলে ফসল কাটার উপযুক্ত সময় হয়। রোপনের দূরত্ব: সয়াবীন সারিতে বপন করতে হয়। সারিতে বপন করলে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৫০ সেমি এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ২৫ সেমি রাখতে হয়।
রোগবালাই ও দমন ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন,সূর্যমুখির পাতা ঝলসানো রোগ ও ঢলে পড়া বা মূল পঁচা রোগ হয়ে থাকে। তবে রোগ সহনশীল কিরণী জাতের সুর্যসুখীর চাষ করলে এ রোগের আক্রমণ কম হয়। পাতা ঝলসানো রোগের ক্ষেত্রে ছত্রাক নাশক প্রয়োগ করা প্রয়োজন। রোগ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে রোভরাল -৫০ ডব্লিউপি (প্রতি লিটার পানির সাথে ২ গ্রাম ছত্রাকনাশক) মিশিয়ে ১০ দিন পর পর তিন বার স্প্রে করতে হবে।
এছাড়াও ঢলে পড়া বা মূল পঁচা রোগ: বীজ শোধনের পূর্বে ভিটাবেক্স-২০০ এর সাহায্যে বীজ শোধনের মাধ্যমে এ রোগের বিস্তার রোধ করা যায়। এছাড়াও গভীর চাষঃ জাম তৈরীর সময় গভীর চাষের মাধ্যমে মাটি আলগা করে ৩-৪ দিন রোদে শুাকিয়ে রোগের উৎস নষ্ট করে আক্রমন কমানো যায়। এছাড়াও বিছা পোকা, কাটুই পোকা ও উই পোকা লাগতে পারে। কাটুই পোকা দমনের ক্ষেত্রে ,প্রতি বিঘায় ৮-১০ট ডাল পুঁতে দিলে এ পোকার দমন করা যায়। চারা অবস্থায় ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করতে হবে। আক্রমণ বেশি হলে এসএনপিভি ০.২-০.৪ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ২বার স্প্রে করতে হবে। ট্রেসার ০.৪ মিলি প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করলে এ পোকার আক্রমণ হতে রেহাই পাওয়া যাবে।
বিছাপোকা দমনে কার্যকরী হচ্ছে প্রতি বিঘায় ৮-১২টি গাছের ডাল বা কঞ্চি পুঁতে দিলে পোকাভোজী পাখি কীড়া খেয়ে দমন করতে পারে। আক্রমণ খুব বেশি হলে রিপকর্ড ১০ ইসি বা পারফেকথিয়ন ৪০ ইসি ২০ মিলি (৪মুখা) প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে আক্রান্ত ক্ষেতে ১০ দিন অন্তর ২ বার স্প্রে করে এ পোকা দমন করা যায়।
প্রয়োজনীর সার প্রয়োগ সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রতি হেক্টরে ইউরিয়া ১৮০-২০০ কেজি, টিএসপি ১৬০-১৮০কেজি, এমপি ১৫০-১৭০কেজি, জিপসাম ১৫০-১৭০কেজি, জিংক সালফেট ৮-১০ কেজি, বরিক এসিড ১০-১২ কেজি, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ৮০-১০০কেজি এবং গোবর ৮-১০টন। অর্ধেক ইউরিয়া এবং বাকি সকল সারের সবটুকু বীজ বপনের পূর্বে শেষ চাষের সময় জমিতে ছিটিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া গাছে ফুল আসার পূর্বে পাশ্ব প্রয়োগ করতে হবে। সেইসাথে প্রয়োজনে নিকটস্থ কৃষি উপসহকারী কৃষি অফিসারের পরামর্শ নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি।