নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে এখন থেকে আরও কম সময়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল পাওয়া যাবে। এতে দ্রুত রোগ নির্ণয় সম্ভব হবে এবং চিকিৎসাও শুরু করা যাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে। সম্প্রতি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কয়েকটি অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি মেশিন বিনামূল্যে পেয়েছে, যেগুলোতে আগের তুলনায় দ্রুত ও অধিক নির্ভুল ফলাফল পাওয়া যায়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, রোগীদের সেবার মান উন্নয়নে হেলথ কেয়ার, এবিসি কর্পোরেশন ও ভিক্টর ট্রেডিং নামের তিনটি প্রতিষ্ঠান এসব মেশিন বিনামূল্যে দিয়েছে। মেশিনগুলোর মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক সেল কাউন্টার, হরমোন অ্যানালাইজার, ইউরিন অ্যানালাইজার, ইএসআর অ্যানালাইজার, ইলেকট্রোলাইট অ্যানালাইজারসহ কয়েক ধরনের পরীক্ষার যন্ত্র। এর মধ্যে চারটি মেশিন ইউরোপে তৈরি। বাকিগুলো ভারত ও চীনে প্রস্তুত করা হয়েছে।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ও পেইন ক্লিনিকের ইনচার্জ সহকারী অধ্যাপক ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, কয়েকটি মেশিন ইতোমধ্যে বহির্বিভাগের প্যাথলজি বিভাগে ব্যবহার শুরু হয়েছে। প্যাথলজি বিভাগের ইনচার্জ ডা. সাবেরা সুলতানার কাছ থেকে তিনি জেনেছেন, নতুন মেশিনগুলোর মাধ্যমে আরও নির্ভুল ও মানসম্মত রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতালের কার্ডিয়াক ল্যাবে বর্তমানে যে পয়েন্ট অব কেয়ার টেস্টিং (পিওসিটি) অ্যানালাইজার রয়েছে, সেটি সাধারণত ছোট আকারের ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত হয়। এ যন্ত্রে প্রতিটি পরীক্ষা আলাদাভাবে চালাতে হয়। ফলে রোগীর রিপোর্ট পেতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে এবং ভোগান্তি বাড়ে। পাশাপাশি ফলাফলের নির্ভুলতাও তুলনামূলক কম।
অপরদিকে নতুন স্থাপিত ম্যাগলুমি এক্স-থ্রি অ্যানালাইজার অত্যাধুনিক কেমিলুমিনেসেন্স ইমিউনোঅ্যাসে প্রযুক্তিনির্ভর। এতে উচ্চ সংবেদনশীলতা ও উচ্চ সুনির্দিষ্টতার মাধ্যমে অত্যন্ত নির্ভুল ফলাফল পাওয়া যায়। যন্ত্রটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২০০টি পরীক্ষা সম্পন্ন করতে সক্ষম। একই সঙ্গে পরীক্ষার ব্যয়ও তুলনামূলক কম।
যন্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদিত। বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য হাসপাতালে এই প্রযুক্তির ম্যাগলুমি মেশিন ব্যবহৃত হচ্ছে। দেশে এ ধরনের মেশিনের সংখ্যা প্রায় ৬৫০টিরও বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে হাসপাতালের বহির্বিভাগের ল্যাবে বর্তমানে ব্যবহৃত ইলেকট্রোলাইট অ্যানালাইজারটি থ্রি-পার্ট অ্যানালাইজার, যেখানে সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ক্লোরাইড—এই তিনটি উপাদান পরীক্ষা করা যায়। নতুন স্থাপিত ফাইভ-পার্ট অ্যানালাইজার দিয়ে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্লোরাইড, পিএইচ এবং বাইকার্বোনেট এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পরীক্ষা সম্ভব। ফলে রোগ নির্ণয় আরও দ্রুত ও নির্ভুল হয়। যন্ত্রটির প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের হলেও এটি ভারতে সংযোজিত।
এছাড়া নতুন স্থাপিত ইএসআর অ্যানালাইজারটি গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ওয়েস্টারগ্রেন পদ্ধতি অনুসরণ করে, যা বিশ্বব্যাপী ইএসআর পরীক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত। এ পদ্ধতিতে অধিক নির্ভুল ফলাফল পাওয়া যায়।
জানা গেছে, এসব মেশিন হাসপাতালকে পেতে সহযোগিতা করেছেন নগরের রাজপাড়া থানা বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান। তাঁর অনুরোধে হেলথ কেয়ার, এবিসি কর্পোরেশন ও ভিক্টর ট্রেডিং মেশিনগুলো বিনামূল্যে সরবরাহ করে।
মিজানুর রহমান মিজান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে নতুন প্যাথলজি যন্ত্রপাতি যুক্ত হয়নি। পুরোনো মেশিনগুলো প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এতে রোগীদের রিপোর্ট পেতে বিলম্ব হয় এবং চিকিৎসা শুরু করতেও দেরি হয়। রোগীদের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিনামূল্যে কিছু মেশিন দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। তারা সেই অনুরোধে সাড়া দিয়েছে। নতুন মেশিনগুলোতে দ্রুত পরীক্ষা করা সম্ভব হবে এবং পরীক্ষার ব্যয়ও আগের তুলনায় কমবে।
হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, নতুন মেশিনগুলোতে পরীক্ষার খরচ তুলনামূলক কম। একই সঙ্গে বিভিন্ন নমুনায় আগের চেয়ে বেশি প্যারামিটার পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মানও উন্নত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুরোনো মেশিনগুলোতে মাঝেমধ্যে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিলে টেকনিশিয়ান এনে মেরামত করতে হয়। ওই সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ থাকে এবং রোগীদের অপেক্ষা করতে হয়। নতুন মেশিন যুক্ত হওয়ায় এ ধরনের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে। তবে পুরোনো মেশিনগুলোও সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে না। নতুন মেশিনের পাশাপাশি সেগুলোতেও প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে।