নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইসলামিয়া ফাজিল (স্নাতক) মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ ওয়ারেস আলীর বিরুদ্ধে ভুয়া সনদের মাধ্যমে চাকরি, জালিয়াতি করে পিএইচডি অর্জন এবং গোপনে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের চেষ্টা সহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ওয়ারেস আলী ২০০৩ সালে স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইসলামিয়া ফাজিল (স্নাতক) মাদ্রাসায় উপাধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। তবে যোগদানের সময় তাঁর প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা ছিল না। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো কামিল পাশ না থাকায় বেতন-ভাতার অনুমোদন না পেয়ে তিনি ভুয়া কামিল সনদ জমা দিয়ে এমপিওভুক্ত হন এবং নিয়মিতভাবে সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন করতে থাকেন। অভিজ্ঞতার অভাবে তিনি প্রভাষক পদমর্যাদায় বেতন গ্রহণ করতেন বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ২০২৩ সালের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী, ফাজিল মাদ্রাসায় উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগের জন্য প্রয়োজন ফাজিল স্তরের কোনো প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ৬ বছরের প্রভাষক পদে অভিজ্ঞতা, অথবা আলিম মাদ্রাসায় ৭ বছরের অভিজ্ঞতা, অথবা কামিল পাসসহ বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ভাষায় ডিগ্রি। অথচ ওয়ারেস আলী কখনোই কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেননি এবং তাঁর প্রকৃত কামিল পাস সনদও ছিল না বলে জানা গেছে। মূলত তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ থেকে পাশ করেছিলেন।
অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সাবেক ওই শিক্ষার্থী বিরুদ্ধে পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জনে গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর এক সাবেক শিক্ষার্থী উপাচার্যের নিকট লিখিত অভিযোগপত্রে দাবি করেন, ওয়ারেস আলী ন্যূনতম যোগ্যতা ছাড়াই ২০০৭ সালে পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁর গবেষণাপত্রের ৯০ শতাংশের বেশি অংশ বিভিন্ন প্রকাশনা ও গবেষণা থেকে হুবহু কপি করা হয়েছে। অনলাইন প্ল্যাগিয়ারিজম পরীক্ষায় বিষয়টি ধরা পড়ে বলে দাবি করা হয়। এছাড়াও গবেষণায় উপাত্ত ও ফলাফল ভুলভাবে উপস্থাপন, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং তৃতীয় পক্ষ দিয়ে থিসিস সম্পাদনার অভিযোগও রয়েছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকিব বলেন, “আমরা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি এবং নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত কমিটি গঠন করছি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী একাডেমিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ পদে গোপনভাবে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ ঘিরে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান উপাধ্যক্ষ ওয়ারেস আলী অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের উদ্দেশ্যে ০২ জুন ২০২৫ তারিখে স্থানীয় দৈনিক বার্তা পত্রিকায় একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন সভাপতির মাধ্যমে। বিষয়টি গভর্নিং বডির কোনো বৈধ সভায় আলোচনা বা সিদ্ধান্ত ছাড়াই গোপনে একটি রেজুলেশন তৈরি করা হয়। জানা যায়, কিছু সদস্যের বাড়িতে গিয়ে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। উক্ত রেজুলেশনে অধিকাংশ স্বাক্ষর জাল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে গভর্নিং বডির সহ-সভাপতি আলহাজ আব্দুস সামাদ ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি জানান, “আমার স্বাক্ষর জাল করে একটি রেজুলেশন দাখিল করা হয়েছে বলে ধারনা করছি এবং তার ভিত্তিতে বাছাই কমিটি ও নিয়োগ বোর্ড গঠন করে অধ্যক্ষ নিয়োগে প্রতিনিধি চেয়ে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর সুপারিশ পাঠানো হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।” তিনি এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
আরও জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর থেকেই ওয়ারেস আলী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদ দখলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি তৎকালীন অধ্যক্ষ আলহাজ্ব জিল্লুর রহমানকে তার অফিসকক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখেন এবং শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। এমনকি জিল্লুর রহমানকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। এ ঘটনায় তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয় এবং বিষয়টির প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। পরে ইউএনওর নির্দেশে পুলিশের প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
এদিকে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আলিম পরীক্ষায় চারজন শিক্ষার্থী কোরআন বিষয়ে বহিষ্কৃত হওয়ার সময় ওয়ারেস আলী পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন। যদিও তিনি ওই সময় পরীক্ষার দায়িত্বে ছিলেন না। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দৃষ্টিগোচর হলে তার সঙ্গে বাকবিতণ্ডাও হয়। শিক্ষকমহলের দাবি, এটি শুধু দায়িত্বে অবহেলা নয়, বরং নিয়োগ ও পরীক্ষা উভয়ক্ষেত্রেই সুপরিকল্পিত অনিয়মের প্রমাণ।
সকল বিষয়ে ওয়ারেস আলীকে মোবাইল ফোনে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তিনি অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ নেবেন বলে সবাই তার বিরদ্ধে উঠে পড়ে লেগেছে। তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই। সকল ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় উভয় অঙ্গনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন শিক্ষক ও অভিভাবকরা মনে করেন, এসব অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম ও সুনাম চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।