নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর গোদাগাড়ীর নিমঘুটু গ্রামে বিষপানে আত্মহননকারী কৃষক রবি মারান্ডি ও অভিনাথ মারান্ডির বাড়িতে যান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দল কেন্দ্রীয় কমিটির এবং রাজশাহী জেলা ও মহানগর এবং বিএনপি নেতৃবৃন্দ। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কৃষক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হাসান জাফির তুহিন, সহ-সভাপতি মামুনুর রশিদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা হাবিবা ও যুগ্ম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য মোশারফ হোসেন নিমঘুটু গ্রামে উপস্থিত হন।
তাঁদের সঙ্গে ছিলেন জেলা বিএনপি’র সদস্য গোলাম মোস্তফা মামুন, রায়হানুল আলম রায়হান, তোফায়েল হোসেন রাজু ও বিএনপি নেতা বিপ্লব প্রিন্সিপাল, কৃষক দল কেন্দ্রীয় কমিটির রাজশাহী বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাজশাহী জেলা কৃষক দলের আহবায়ক আল আমিন সরকার টিটু, কৃষক দল কেন্দ্রীয় কমিটির রাজশাহী বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও রাজশাহী মহানগর কৃষক দলের আহবায়ক ওয়াদদু হাসান পিন্টু, জেলা কৃষক দলের সদস্য সচিব নাজমুল হক, গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি আব্দুস সালাম শাওয়াল, জেলা কৃষক দলের যুগ্ম আহবায়ক মুহিব্বুল হক রুবেল, মেরাজুল ইসলাম, জয়নাল আবেদীন, আব্দুর রফিক সরকার, মান্নাফ ও সদস্য রেজাউল করিম রঞ্জু, দেওপাড়া ইউপি ৪নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সভাপতি আব্দুস সাদেক ও জেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক রবিউল ইসলাম কুসুমসহ বিএনপি, কৃষকদল, অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মী।
ঘন্টাব্যাপি সদস্যরা গোদাগাড়ীর নিমঘুটু গ্রামে ছিলেন। এ সময়ে সেখানে হৃদয় বিদারক ঘটনার অবতারনা হয়। কৃষকদলের নেতৃবৃন্দদের দেখে অভিনাথের স্ত্রী রোজিনা হেমব্রম কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এদিকে রবি মা নিজ বাড়িতে ছেলে শোকে মৃত্যুশয্যায় রয়েছেন। সভাপতি হাসান জাফরী তুহিন বলেন, মিডিয়া মারফত তাঁরা এই ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘটনাস্থলে আসার নির্দেশনা দেন। তাঁরই নির্দেশে তাঁরা এখানে এসেছেন। তিনি বলেন, এই কৃষকদ্বয় দীর্ঘ ১২দিন ধরে জমিতে পানি চাইলেও অপারেটর সাখাওয়াত হোসেন পানি না দিয়ে তাদের পানির পরিবর্তে বিষ খাওয়ার কথা বলেন। পানি না পেয়ে ক্ষোভে দু:খে এই দুই ভাই বিষপানে আত্মহত্যা করেন বলে জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন সাখাওয়াত দেওপাড়া ইউনিয়ন কৃষক লীগের সভাপতি হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এখন আবার দলীয় প্রভাব খাটিয়ে মামলা ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি। সারা দেশে বর্তমানে এই অবস্থা বিরাজ করছে। কেউ এখন ভাল নেই। সেইসাথে কৃষকরা আরা খারাপ অবস্থায় আছে। নলিতাবাড়ির এক কৃষক নিজের জমিতে পানি সেচের জন্য সেচ পাম্প বসাতে না পেরে নিজের জমিতে মঞ্চ করে ফাঁসিতে ঝুলে ছিলেন। সেখানেও তাঁরা গিয়েছিলেন। তাঁরা এই সকল ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। সেইসাথে আসামীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান নেতৃবৃন্দ। পরে মৃত উভয় পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সহযোগিতা করেন।
এদিকে কান্নাজড়িত কন্ঠে অভিনাথের স্ত্রী রোজিনা হেমব্রম বলেন, মৃত্যুর আগে তাঁর স্বামী তাঁকে বলেছেন যে পানি না পাওয়ার কারণে তিনি বিষপান করেছেন। ঘটনার বর্ণনা দেন অভিনাথের ভাবি পার্বতী সরেন। তিনি বলেন, সকালে বাড়ির নারীরা আলু উত্তোলনের কাজে বের হচ্ছিলেন। তখন রবি ও অভিনাথ তাদের জানান, ১০-১২ দিন ঘুরেও তাঁরা পানি পাচ্ছেন না। তবে ২১ মার্চ সোমবার তাঁদের জমিতে পানি দেওয়ার কথা আছে। তাঁরা পানি দিতে যাবেন। বিকেলে তাঁরা যখন আলু তুলছিলেন তখন শোনেন যে পানি না দেওয়ার কারণে রবি ও অভিনাথ বিষপান করেছেন। অভিনাথের ভাবি বলেন, পানির জন্য অপারেটর ঘোরান। সে কারণে দুঃখে দুজন বিষ পান করেন।

রবি ও অভিনাথের এক প্রতিবেশী বলেন, তাঁর তিন বিঘা জমিতে ধান আছে। শেষবার পানি পেয়েছেন ১২ দিন পর। তিনি অভিযোগ করেন, পানি দিতে সাখাওয়াত স্বজনপ্রীতি করতেন। ওঐ মাঠের অর্ধেক কৃষক আদিবাসী। তাঁদের পানি পরে দেওয়া হতো।
রবি মারান্ডির ভাই সুশীল মারান্ডি জানালেন, ঘটনার দিন তিনি নাটোরে কর্মক্ষেত্রে ছিলেন। মায়ের নিকট থেকে তিনি জানতে পারেন রবি বিষপান করে একাই বাড়ি আসেন। তারপর মাকে বলেন, ‘মা আমি পানি না পাওয়ার কারণে বিষ খেয়েছি। মা, আমি আর বাঁচব না।’ তারা পানির জন্য হাহাকারের কথা শোনালেও স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অতনু সরকার নিজের লিখিত জবানবন্দিতে লিখেছেন, ‘জমিতে কীটনাশক দেওয়ার সময় পার হয়ে গেছে। এখন আর পানিরও তেমন দরকার নেই।’
উল্লেখ্য গত ২১ মার্চ সোমবার রবি ও অভিনাথ বিষপান করেন। সেদিনই বাড়িতে অভিনাথের মৃত্যু হয়। দুদিন পর হাসপাতালে মারা যান রবি। মৃত্যুসনদে বলা হয়েছে বিষক্রিয়ায় রবির মৃত্যু হয়েছে। দুই কৃষকের মরদেহের ময়নাতদন্ত হলেও প্রতিবেদন এখনো প্রস্তুত হয়নি। তাদের মৃত্যুর জন্য গভীর নলকূপ অপারেটর সাখাওয়াতকে দায়ী করে দুই পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় দুটি আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করা হয়েছে। প্রথম মামলাটি হওয়ার পরই সাখাওয়াত পালিয়েছেন। পুলিশ তাঁকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি।