নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী চিড়িয়ানা খানা, একশ বিঘা জমির উপরে এটা প্রতিষ্ঠিত হলেও এখানে পতিত সরকারের আমলে আট বিঘা জমির উপরে তৈরী করেছে নভোথিয়েটার। অথচ এই চিড়িয়াখানায় ছিলো নানা প্রজাতীর গাছ এবং নানা ধরনের পশু ও পাখি। এই চিড়িয়াখানায় রাজশাহীবাসীসহ বিভাগের অন্যান্য জেলা থেকে ভ্রমন পিপাসুরা আসতো। এখান থেকে সিটি কর্পোরেশন কোটি কোটি টাকা আয় করতো। সেইসাথে সরকার পেত হাজার হাজার টাকা রাজস্ব।
কিন্তু পতিত সরকারের আমলে স্বৈরাচার হাসিনার দোসর আরেক স্বৈরাচার ও লুটেরা রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক পলাতক মেয়র এ.এইচ.এম খায়রুজ্জামান লিটন রাজশাহী চিড়িয়াখানাকে বোটানিক্যাল গার্ডেন বানানোর লক্ষে এবং কথিত সংস্কারের নামে কেটেছে প্রায় চারশত বিভিন্ন প্রজাতীর বড় বড় গাছ। এরমধ্যে ছিলো অর্জুন, আকাশমনি, নারকেল ও নানা প্রজাতীর কড়াই গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতীর গাছ। যার মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। এই গাছগুলো নামমাত্র মূল্যে আওয়ামী দলীয় ক্যাডারদের নিকট বিক্রি করলেও সেই টাকা আজও সিটি কর্পোরেশনে জমা হয়নি বলে বিশস্তসূত্রে জানা গেছে।
এটাই শেষ নয় এই চিড়িয়াখানায় ছিলো বিভিন্ন পশু পাখির লোহার খাঁচা। ঐ খাঁচাগুলো সাবেক মেয়র তার দোসরদের দিয়ে দিয়েছে। তার মূল্য কোটি টাকার কম নয় বলে জানা গেছে। আরো জানা গেছে চিড়িয়াখানার নয়া অফিস এর উপরের কক্ষগুলোতে চলতো অনৈতিক কাজ। সেখান থেকে সাবেক আওয়ামী যুবলীগ ও অঙ্গ সহযোগি সংগঠনের নেতারা মাসে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা করে আয় করতো বলে জানা গেছে।
এদিকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানায় বেড়াতে আসা নওগাঁর আলী আশরাফ, নাটোরের অমিত কুমারসহ আরো বেশ কয়েকজন বলেন, তারা রাজশাহীতে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। এর আগেও তারা চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন। ডাক্তারের চেম্বারে বসতে দেরী দেখে তারা এই চিড়িয়াখানায় এসে বিশ্রাম ও বেড়াতেন। এখানে অনেক প্রজাতীর গাছ ছিলো। গাছের জন্য একটু দূরে কিছু দেখা যেতনা। এছাড়াও ছিলো বিভিন্ন প্রজাতীর পশু পাখি ও সাপ। এগুলো দেখে সন্তানেরা মজাপেত এবং তারাও গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতেন। যতই রোদ পড়ুক আর গরম হোক, এখানে অনেক শান্তি পাওয়া যেত। সেইসাথে বিভিন্ন প্রজাতীর উন্মুক্ত পাখীর ডাকে মনটা ভালো হয়ে যেত বলে উল্লেখ করেন তারা।
পবা নওহাটার আসিক, শহরের বেলাল হোসেন, ইশিতা ও সুরাইয়া খাতুনসহ আরো অনেকে বলেন, রাজশাহী এমনিতে একটি অন্য রকম শহর। এখানে প্রকৃতির ভারসাম্য অনেক কম। গরমের সময় প্রচন্ড গরম এবং শীতের সময় প্রচন্ড শীত পরে। এর ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাবেক মেয়র ও সংসদ সদস্য বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনু ও আরেক সাবেক মেয়র বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক, রাজশাহী মহানগর বিএনপি’র সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল হাজার হাজার বৃক্ষ রোপন করে শহরকে গ্রীন সিটি হিসেবে স্বীকৃতি নিয়েছিলেন।
তারা আরো বলেন, এই গ্রীন সিটিকে মরুময় সিটিতে রুপান্তরিত করেছেন সাবেক পলাতক মেয়র এ.এইচ.এম খাইরুজ্জামান লিটন। তিনি উন্নয়নের নামে শহরের হাজার হাজার শতবর্ষী এবং ছোটবড় গাছ কেটে ফেলেছেন। সেইসাথে চিড়িয়াখানার গাছও কেটে ফেলেছেন। এতে করে মহানগরী এখন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। তিনি সহ সকলেই গাছ কেটে চিড়িয়াখানা ফাঁকা এবং নগরকে মরুময় করতে দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবী জানান।
এ বিষয়ে রাজশাহী কেন্দ্রীয় বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. ফরহাদ উদ্দনি বলেন, করোনা মহামারীর সময়ে যখন পাবলিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হলো চিড়িয়াখানাটিও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এ সময়ে তিন বছরের মত চিড়িয়াখানায় বন্ধ ছিলো। চিড়িয়াখানা বন্ধ থাকায় প্রকৌশল বিভাগ মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী উন্নয়নমূলক এর কাজ শুরু করা হয়। কাজ শুরু করতে গিয়ে তারা যে ডিজাইন এবং প্ল্যানিং করে প্রদর্শতীত পশুপাখির খাঁচাগুলি সব ভেঙে ফেলা হলো ভেঙ্গে ফেলে। তখন ঐ সমস্ত পশু পাখি কোথাও না কোথাও তো রিপ্লেসমেন্ট করা হয়। কিছু পশু পাখি দিনাজপুর স্বপ্নপুরী কর্তৃপক্ষের নিকট বিক্রি করা হয়। অনেক পশুপাখি অনেকে নিয়ে চলে যায়। সেইসাথে সংস্কার করার নামে মরা গাছসহ শতবর্ষীসহ ছোট বড় প্রায় চারশত নানা প্রজাতির গাছ বিক্রি কেটে ফেলে।
তিনি আরো বলে, কিছু পশু পাখি কেনা ও ফ্রিতে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। সেইসাথে চিড়িয়াখানার ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপন করা হবে। এ নিয়ে রাসিক এর পরিবেশ শাখার কথা বলা হয়েছে। আর বৃক্ষরোপনের জন্য সমাজের সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, নভোথিয়েটার হওয়ায় চিড়িয়াখানার ব্য্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আট বিঘা জমি সেখানে চলে গেছে। যার কোন আউটপুট নাই। তিনি আরো বলেন, একটি চিড়িয়াখানা করতে হলে ৭৫ ভাগ গাছ থাকতে হয়। যাতে করে পশুপাখি নিরাপদে থাকতে পারে। কিন্তু সাবেক পলাতক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন সব ধ্বংস করে গেছেন। একদেিক বৃক্ষ নিধন আরেকদিকে নভোথিয়েটার করে চিড়িয়াখানাকে নষ্ট করে দিয়ে গেছনে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এমন অবস্থা চিড়িয়াখানার করে গেছেন এখন বড় খাঁচা তৈরীর করার জায়গাই বলে জানান তিনি।

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা, রাসিক সাবেক মেয়র ও সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনু বলেন, পৃথিবীর প্রতিটি দেশ এবং সিটি কর্পোরেশন গুলোতে এই ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কারন শিশু থেকে শুরু করে সকল শ্রেণিপেশার মানুষ চিড়িয়াখানায় আসে একটু নির্মল বাতাস ও শান্তি পেতে। এছাড়াও অনেক রাগী শিশুরা চিড়িয়াখানায় আসলে তাদের রাগ অনেকাংশে কমে আসে। তিনি আরো বলেন, পার্ক যেমন বৃক্ষের অভয় আশ্রয়স্থল, তেমনি পার্ক হচ্ছে একটি শহরের ফুসফুস। কারন এখান থেকে শহরের মানুষসহ প্রাণীকুল অক্সিজেন গ্রহন করে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, এই পার্কটি এক সময়ে জেলা পরিষদের অধিনে ছিলো। সে সময়ে পার্কের মধ্যে তেমন গাছপালা ছিলোনা। ছিলোনা উল্লেখযোগ্য পশুপাখি। তিনি ১৯৯২ সালে পার্কটি সিটি কর্পোরেশনের অধিনে নিয়ে প্রচুর বৃক্ষরোপন করেন। সেইসাথে দেশ বিদেশ থেকে নানা ধরনের পশুপাখি, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, অন্যান্য বাঘ, হায়না, ভাল্লুক, সাপ, কবুতর, বানর, গাধাসহ নানা ধরনের পশু নিয়ে আসেন। সে সময়ে সকল শ্রেণির মানুষ পার্কে গিয়ে বিনোদন করতো। কিন্তু পতিত সরকারের আমলে পলাতক সাবেক মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন উন্নয়নের নামে এই পার্কটি ধ্বংস করে ফেলেছে। বিএনপি আগামীতে ক্ষমতায় আসলে পার্কের সেই হারানো ঐতিহ্য আবারও ফিরিয়ে আনা হবে বলে উল্লেখ করেন মিনু।