নিজস্ব প্রতিবেদক: সারা দেশের ন্যায় রাজশাহীতে নানা আয়োজনে মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয়। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এই তিদটি একটা ঐতিহাসিক দিন। মঙ্গলবার দিবসের শুরুতে রাত ১২.০১ এটায় রাজশাহী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চত্বরে শহিদ মিনারে ভাষা শহিদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহ্রিয়ার আলম-এমপি, বিভাগীয় কমিশনার জি এস এম জাফরউল্লাহ্ এনডিসি, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল বাতেন, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার আনিসুর রহমান, জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল, পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানান।
এছাড়াও বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজশাহী ওয়াসা, রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির কালচারাল একাডেমি, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, ট্যুরিস্ট পুলিশ, বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ, রাজশাহী জেলা পরিষদ, পিবিআই ও সমবায় অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি দপ্তর ও সংস্থা, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহিদদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।
সূর্যদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি-বেসরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। সকালে নগরীর বিভিন্ন শহীদ মিনার অভিমুখে জনগণ প্রভাত ফেরি করে পুস্পস্তবক অর্পন করেন। মহানগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংগঠন, সংস্থার সদস্য ও সর্বস্তরের জনগণ প্রভাত ফেরিতে অংশ নেন।
এদিকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে এবার ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলো জেলা প্রশাসন। ইসলামী ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মহানগরীর হেতেম খাঁ মসজিদে ভাষা শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে বাদ যোহর কোরআন খানি ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে সুবিধামতো সময়ে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।

দিবসটি উপলক্ষ্যে সকাল এগারোটায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ‘জাতীয় জীবনে একুশের চেতনা’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় বক্তারা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং জাতীয় জীবনে এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা করেন।
জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার জিএসএম জাফরউল্লাহ্, এনডিসি। ভাষাসৈনিক মোশাররফ হোসেন আখুঞ্জী সম্মানিত অতিথি হিসেবে এবং কবিকুঞ্জর সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমিন প্রামাণিক আলোচক হিসেবে সভায় বক্তৃতা করেন। এসময় ভাষা আন্দোলনের সকল শহিদ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতাসহ মুক্তিযুদ্ধে শহিদ সকলকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, আজকে যারা আমাদের আলোচনা শুনছেন, তারা শুধু আমাদের সম্মান করছেন তা নয়, ৭১ বছর আগে যারা মাতৃভাষা বাংলার জন্য শহিদ হয়েছেন তাদের সম্মান দিচ্ছেন। তিনি বলেন, একুশ মানে মাথা নত না করা। আমরা কেন বীর বাঙালি হলাম? এর শুরু কিন্তু একুশ দিয়ে। বিশ^ তাক লেগে যায়Ñ একটি জাতি ভাষার জন্য জীবন দিতে পারে, শুধু তাদের মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।
পশ্চিম পাকিস্তানীদের বাংলা ভাষার প্রতি হীন মনোভাব তুলে ধরে প্রধান অতিথি আরো বলেন, আমরা কী চেয়েছিলাম? উর্দু ভাষায় আপনারা কথা বলেন। শুধু আমাদের বাংলা ভাষা নিয়ে টানাটানি করবেন না। আমরা আমাদের ভাষায় যথেষ্ঠ সাবলীল। কিন্তু তারা জোর খাটাতে চেয়েছিলো।
বাংলা ভাষার প্রতি নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ তুলে ধরে দুঃখ প্রকাশ করে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, নতুন প্রজন্ম বাংলার পরিবর্তে অন্যান্য বিদেশি ভাষায় আগ্রহী হচ্ছে। কিছু কিছু অতি স্মার্ট পরিবার তাদের সন্তানদের এমন কিছু প্রতিষ্ঠানে পড়ান, যেখানে বাংলা বাদ দিয়ে পড়ানো হয়। তিনি নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা শ্রদ্ধাভরে চর্চার আহ্বান জানান। বাঙালি জাতি বাংলা বলে-ই এগিয়ে যাবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমরা যারা বাংলাকে ভালবাসি, বাংলা ভাষাকে ভালবাসি, তারা যেন ভাষা শহিদদের শ্রদ্ধা জানাতে পারি।
আলোচনা সভা শেষে শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত চিত্রাঙ্কন, রচনা, আবৃত্তি ও দেশাত্মবোধক সংগীত প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পরে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।এদিন রাজশাহী মহানগরীর সড়কদ্বীপ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে বাংলা বর্ণমালা সম্বলিত ফেস্টুন দ্বারা সজ্জিত করা হয়।