নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে এসএসসির গণিত ও ইংরেজি বিষয়ের খাতা পুনর্নিরীক্ষণের পর আবারও পুনর্নিরীক্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ২৭ জন শিক্ষককে বোর্ডে ডেকে নিয়ে এসব খাতা দেখা হয় বলে বোর্ডের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
বোর্ড সূত্র জানায়, এসএসসির ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ম অনুযায়ী খাতা পুনর্নিরীক্ষণ করা হয়। এবারও আবেদন করা খাতাগুলো কয়েক ধাপে শিক্ষকদের দিয়ে পুনঃনিরীক্ষণ করা হয়েছে। তবে ওই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও ‘আশানুরূপ’ ফল না আসায় পুনর্নিরীক্ষণ করা খাতাগুলো আবারও পরীক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, একই খাতা দ্বিতীয় দফায় পুনর্নিরীক্ষণের জন্য রাতে একসঙ্গে এত শিক্ষককে ডেকে কাজ করানোর ঘটনা নজিরবিহীন।
রাতে শিক্ষা বোর্ডে এত কিছু হলেও কিছুই জানতেন না সচিব অধ্যাপক ড. মো. আব্দুর রউফ। তিনি বলেন, তিনি পৌনে ছয়টার সময় চেয়ারম্যানের সঙ্গেই অফিস থেকে নেমে গিয়েছিলেন। তারপর রাতে বাসায় ঘুমিয়েও পড়েছিলেন। রাত ১.৩০টার সময় ছেলে ঘুম থেকে ডেকে তুলে দেখায় যে তার ফোনে বিভিন্ন ধরনের ম্যাসেজ এসেছে। এটা দেখে তিনি হতভম্ব হয়ে যান বলে জানান। এগুলো আসলে দুঃখজনক।

তিনি জানান, তারা পরিকল্পনা করেছিলেন যে ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুনঃনিরীক্ষণের আবেদনকৃত খাতা দেখা শেষ করবেন। আর ৫ সেপ্টেম্বর ফলাফল জমা দিয়ে দেওয়া হবে। তার জানামতে, ১ তারিখেই খাতা দেখা শেষ হয়েছে। তারা অফিস থেকে চলে যাওয়ার পরে রাতে আবার কেন খাতা দেখা হয়েছে তা তিনি জানেন না। এ বিষয়ে কেউ তাঁকে কিছু জানায়নি। তাই তিনিও নিজের থেকে খোঁজ নিতে যাননি।
দ্বিতীয় দফায় খাতা দেখার অভিযোগের বিষয়ে জানতে মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষা বোর্ডে গিয়ে দেখা যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা ভেতরে অবস্থান করছেন। সাংবাদিকদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি না থাকায় প্রধান ফটক থেকেই তাঁদের ফিরে আসতে হয়।
রাত সাড়ে ১১টার পর প্রধান ফটকের সামনে আসেন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী। তাঁকে দেখে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরিন প্রধান ফটকে আসেন। এর আগে তাঁকে অনেকবার ডাকা হয় কথা বলার জন্য। কিন্তু তিনি আসেননি।
এ সময় চেয়ারম্যান সাংবাদিক নানা প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘তাদের কাজ শেষ হয়নি। রেজাল্ট দিতে হবে তাড়াতাড়ি। এই জন্য রাতে কাজ হচ্ছে।’ পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করা খাতা দেখা শেষ হওয়ার পরও আবার কেন দেখা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, ‘খাতা দেখে ছেড়ে দিয়েছেন, কিন্তু তাদের মনে হয়েছে আরও দেখা দরকার। ভালো করে দেখা দরকার। ইংরেজি আর অঙ্কের খাতা অনেক বেশি ফেল করেছে এবং অনেক খাতা। সেগুলো দেখতে একটু দেরি হয়েছে।’
খাতা দেখে ফেল করা শিক্ষার্থীদের পাস করানো হচ্ছে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, না। নো, নো, নো। তাদের দেখার কিছু বাকি ছিল। সেগুলো দেখা দরকার, তাই দেখছে। একটা করে দেখা হচ্ছে, ছেড়ে দিচ্ছি। তাদের বুয়েটের কাছে মার্ক হস্তান্তর করতে হবে, সেই জন্য।’
রাতে খাতা দেখার কারণ জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, ‘দিনে শিক্ষকেরা চাকরি করেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। তাদের মনে হয়েছে সুবিধামতো সময়ে সন্ধ্যার পরে তাদের দিয়ে কাজ করানো যেতে পারে। বুধবার মার্ক হস্তান্তর করতে হবে। সময় একেবারে নেই।’ পরে চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ভেতরে চলে যান। রাত ১২টার দিকে শিক্ষা বোর্ড থেকে শিক্ষকেরা বের হয়ে যান।
রাজশাহী বোর্ডে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৫২ জন। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত ফলাফলে ১ লাখ ১২ হাজার ৮৬ জন পাস করে। পাসের হার ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ হাজার ১১৩ জন। ছাত্রীদের পাসের হার ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ছাত্রদের ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
উল্লেখ্য গত ১৭ আগস্ট পর্যন্ত রাজশাহী বোর্ডে ৯৮ হাজার ৭১০টি খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবেদন পড়েছে ইংরেজি ও গণিতে। আজ বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।