ফজলুল করিম বাবলু: দাঁড়াশ একটি বিষহীন সাপ। এদের দেহের রং হালকা বাদামি বা হলুদ বাদামি কিংবা জলপাই বাদামি। সাপটিকে গোখরা সাপ বলে ভূল করে মানুষ। এ কারণে সাপটি মানুষের হাতে বেশি মারাও পড়ে। এদের মাথায় সাধারণত কোনো ফণা থাকে না এবং মাথা গোখরা সাপের মাথার তুলনায় বেশ সরু। লম্বায় সাধারণত দুই মিটার, তবে কোনো কোনোটি তিন মিটার বা ততোধিক লম্বা হতে পারে। দাঁড়াশ সাপ গাছ বেয়ে উঠতে দক্ষ, সাঁতার কাটতে, ডুব দিয়ে থাকতে এবং দ্রুত ছুটতে পারে। ধরা পড়ার পর কিছুটা মারমুখি দেখালেও পরে খুব সহজেই পোষ মেনে যায়। ইঁদুর, ছুঁচো, ব্যাঙ ইত্যাদি খেয়ে দাঁড়াশ সাপ জীবনধারণ করে। শিকার ধরামাত্রই গিলতে শুরু করে এরা।
এ অঞ্চলে কেবল এ সাপই ‘যুদ্ধ নাচ’ দেখায়। প্রতিদ্বন্দতী দুটি পুরুষ সাপের মধ্যে এ লড়াইয়ে এরা পরস্পর দেহের অর্ধেক রশির মতো পেঁচিয়ে মাটির সমান্তরালে অথবা কিছুটা উপরে থাকে। গ্রামাঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ একে গোখরা ও দাঁড়াশের মধ্যে যৌনমিলনের দৃশ্য মনে করে। দাঁড়াশ প্রায় এক ডজন আঠালো ডিম পাড়ে এবং দুই মাসের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। স্ত্রী সাপ প্রায় দু’মাস ডিমের চারপাশে কুন্ডলী পাকিয়ে অবস্থান করে। এদের চামড়ার যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। কোরিয়ান ও চীনারা দাঁড়াশ সাপের মাংস খেতে পছন্দ করে।
অঞ্চলভেদে দারাজ, ডাঁড়াশ, ধারাজ প্রভৃতি নামে বাংলাদেশের এক অতিপরিচিত বিষহীন সাপ। সাধারণত এ সাপকে মানুষের আবাসস্থলের আশপাশে, চাষের জমি, বন-জঙ্গল বা ছোটো ঝোপঝাড়ে দেখতে পাওয়া যায়। এই সাপকি বিষাক্ত? অনেকেই হয়তো বলবেন ‘হ্যা’। আসলে তাদের উত্তরটি সম্পূর্ণভাবে ভুল। পৃথিবীতে প্রায় ৩ হাজার প্রজাতির সাপ বিজ্ঞানীরা সনাক্ত করেছেন। তার মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশ বিষাক্ত। আর বাংলাদেশে দেশে প্রায় ৯০ প্রজাতির সাপের বিচরণ রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে বিষাক্ত সাপ মাত্র ৫ শতাংশ।
আক্ষেপের কথা হলো- শুধুমাত্র ভুল ধারণা আর কুসংস্কারের কারণেই প্রাণ হারাচ্ছে কৃষির উপকারী দাঁড়াশ সাপ। দাঁড়াশ বিষাক্ত সাপ নয় মোটেই। কিছু মানুষ এটিকে বিষাক্ত সাপ মনে করে একে দেখা মাত্র প্রাণে হত্যা করে থাকেন। আর এর ফলেই এ নির্বিষ অর্থাৎ বিষমুক্ত দাঁড়াশ সাপগুলো জীবন বর্তমানে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে।
প্রধান খাবার ইঁদুর বলেই এ সাপটির ইংরেজি নামেও রয়েছে ইঁদুরের ইংরেজি নামের পরশ। এর ইংরেজি নাম Indian Rat Snake বৈজ্ঞানিক নাম Ptyas mucosa। ফসলের ক্ষতিকর ইঁদুর খেয়ে এরা কৃষক এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্যের অভাবনীয় উপকার সাধন করে চলেছে। এই উপকারী সরীসৃপ প্রাণীটির প্রতি আরো সচেনতা বাড়ানোর কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন এই সাপ সারাদেশেই পাওয়া যায়। তাই এখনো থ্রেড ক্যাটাগরিতে আসেনি। তবে আগে যে রকম পাওয়া যেত তা আস্তে আস্তে কমে আসছে। এর কারণ হচ্ছে তার আবাসস্থল ধ্বংস এবং প্রজনন সমস্যা। এছাড়াও দ্বিতীয় কারণ হলো, লোকজনের হাতে প্রচুর পরিমাণ মারা পড়ে এই সাপটি।’
সাপ দেখলেই বেশিরভাগ মানুষের স্বভাব তা মেরে ফেলা। তবে সব যে বিষধর নয় তা মানুষ বোঝেই না। ফলত সাপ দেখামাত্রই তাকে হত্যার জন্য ছুটে যায় মানুষ। এছাড়াও কিছু কুসংস্কার বিশেষ করে গ্রামের দিকে অনেকে দাবি করেন এমনকি নিজে চোখে দেখেছেন বলেও জানান, সাপ গরুর পা পেঁচিয়ে গরুর বাটে মুখ লাগিয়ে দুধ খাচ্ছে ! আসলে,এরা তো স্তন্যপায়ী নয় যে মায়ের দুধ খেয়ে বড়ো হয়েছে এবং দুধ দেখলেই খেতে চাইবে । এরা হলো সরীসৃপ ! জন্মের পর থেকেই পোকামাকড় ব্যাঙ শিকার করে খায় । তাছাড়া এরা ল্যাকটজ ইনটলারেন্ট অর্থাৎ দুধ হজম করতে পারে না ।
অনেক সময় সাপ ইঁদুরের খোঁজে গোয়াল ঘরে ঢুকে পরে তা দেখে গরু ভয় পেয়ে লাফালাফি করে এবং সেই দেখে সাপও ভয় পেয়ে পা জড়িয়ে ধরতে পারে । তারা আরো উল্লেখ করেন পৃথিবীতে এমন কোনো সাপ নেই যার লেজে বিষাক্ত কাঁটা আছে । যারা বিষধর সাপ তাদেরও মুখে বিষ থলিতে বিষ থাকে। দাঁড়াস সম্পূর্ণ নির্বিষ আর লেজেও কোনো কাঁটা নেই । এগুলো ভ্রান্ত ধারণা ছাড়া কিছুই নয়। এই পা পঁচে যাওয়ার গুজব টা একটা নির্ভেজাল কুসংস্কার! দাঁড়াস যদি কামড়ে দেয় তাহলে ব্লেডে কেটে গেলে যা যা করেন তাই তাই করতে হবে। ডেটল লাগিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে হবে। প্রয়োজনে টিটেনাস ইনজেকশন নেয়া যেতে পাওে, ইনফেকশন এর কবল থেকে রক্ষা পেতে।