নিজস্ব প্রতিবেদক: ইসলামী ব্যাংকের শাখাগুলোতে ঋণের নামে চলছে হরিলুট। ঋণ বিতরণের কোনো নীয়মনীতি মানা হচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে নামসর্বস্ব কাগুজে প্রতিষ্ঠানে বিপুল পরিমাণে ঋন প্রদান করছে ইসলামি ব্যাংক। বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ঋণের নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের খোলসে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র । ফলে সময় পার হলেও আদায় হচ্ছেনা ওই সকল ঋনের টাকা।
এরই ধারাবাহিকতায় রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার রায়ঘাটি এলাকার বৃ-হাটরা গ্রামের শামসুল আলম (৫০) মিনহাজ কৃষি বিতান নামে একটি নাম সর্বস্ব ভূয়া প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, কেশরহাট শাখা হতে প্রায় পয়ষট্টি লাখ টাকা ঋন নেন। ব্যাংকে মর্গেজ দেন সাড়ে আট বিঘা জমি। মর্গেজ দেওয়া জমির মধ্যে ১৫ শতাংশ জমি আছে অন্যের নামে। যার মর্গেজ ভ্যালু ১৫ লাখ টাকা। ক্রয়কৃত জমির তফশিল হচ্ছে উপজেলা-মোহনপুর, মৌজা-বৃ-হাটরা, জে. এল নং-২৬, আর.এস খতিয়ান- ১৪৩, প্রস্তাবিত খতিয়ান নম্বর- ৪২৯, দাগ নম্বর-৬৯৫, রকম- ধানী, পরিমাণ- ৫১ শতক।
যা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জেনে বুঝে মর্গেজ গ্রহণ করেন। মিনহাজ কৃষি বিতান প্রোপাইটর সামসুল সময়মত ঋন পরিশোধে ব্যর্থ হলে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের চাপে পড়েন শাখা প্রধান সিরাজুল ইসলাম। বেড়িয়ে আসে ঋন প্রদানের আসল তথ্য।
ম্যানেজার সিরাজুল ইসলাম তার শাখার সুনাম ধরে রাখতে কোভিড-১৯ এ বিশেষ সুবিধা সম্পন্ন ঋন পরিশোধে ব্যর্থ গ্রাহক শামসুল আলম ও তার স্ত্রী কহিনুর বেগমের সাথে যোগসাজশ করে কেশরহাট ইসলামী ব্যাংক শাখায় মর্গেজ রাখা জমির তথ্য গোপন করে ওই জমি কক্রয় করতে কৃষিবিদ শফিকুল ইসলামকে অনুরোধ জানান বলে জানান গেছে। ব্যাংক ম্যানেজারের অনুরোধ ও আশ্বস্ততায় জমি ক্রয় করতে রাজি হন শফিকুল ইসলাম। এ বিষয়ে ম্যানেজার কক্ষে বসে কহিনুর বেগম ও সামসুলের উপস্থিতিতে ৫১ শতক জমির ৪৪লক্ষ টাকা দরদাম নির্ধারণ করেন।
ব্যাংক ম্যানেজার মিনহাজ কৃষি বিতান শামসুল আলমের ঋন হিসেবে নগদ পনের লাখ টাকা জমা নিয়ে গত বছরের ১৩ জুন মোহনপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিসে এসে ৫১ শতক জমি শফিকুলের নামে বায়নামা রেজিষ্ট্রি করে দেন কহিনুর বেগম। যাহার স্মারক নং-২৬৩৭/২৩।পরে জানাযায় বায়নাকৃত জমির মধ্য ১৫ শতাংশ জমি অন্যের নামে আছে। যা জেনে বুঝে ইসলামী ব্যাংক ম্যানেজার ও গ্রাহক শামসুল দম্পতি বিক্রয়ে প্রতারনা করেছে ।
এদিকে জমিটি বায়নামা রেজিষ্ট্রি হওয়ায় ঋন হিসেবে টাকা জমা হলে চাপ কমে যায় ব্যাংক ম্যানেজারের এবং জমি বিক্রির টাকা পেয়ে লোন রিকভারি করে নিশ্চিন্ত হয়ে পড়েন শামসুল ও তার স্ত্রী কহিনুর বেগম। বায়না চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ছয় মাসের মধ্যে শামসুল আলম ও তার স্ত্রী কহিনুর বেগম ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলামকে জমি রেজিষ্ট্রি করে দেবেন। এদিকে ছয় মাস অতিবাহিত হতে চললেও শামসুল দম্পতি জমি রেজিষ্ট্রি করে দিতে কালক্ষেপন শুরু করেছে এবং শফিকুলকে দিনের পর দিন ঘোড়াতে থাকে। সর্বশেষ গত বছরের ১০ডিসেম্বর শামসুলের বাড়িতে তার ভাইদের নিয়ে স্থানীয় মেম্বর ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ মিলে সিদ্ধান্ত নেন ১২ ডিসেম্বর মোহনপুর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে গিয়ে সকল জমি রেজিষ্ট্রি করে দেবেন শামসুল দম্পতি। নির্ধারিত তারিখ ও দিনে ব্যবসায়ী শফিকুল স্বাক্ষীদের নিয়ে মোহনপুর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে সারাদিন বসে থাকলেও আসেনি শামসুল ও তার স্ত্রী কহিনুর বেগম। নিরুপায় হয়ে ব্যবসায়ী শফিকুল একবার ব্যাংক ম্যানেজারের নিকট আরেকবার শামসুলের বাড়িতে ঘুরেও সেদিন জমি রেজিষ্ট্রি করতে পারেন নি। উল্টো ব্যবসায়ী শফিকুলকে সামসুল ও তার স্ত্রী কহিনুর হুমকি ধামকি দিচ্ছে বলে জানান ভূক্তভোগি।
বিষয়টি নিয়ে শফিকুল ১৩ ডিসেম্বর ২০২৩ মোহনপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেন। এঘটনায় সামসুল ও তার স্ত্রী কহিনুরকে ডেকে পাঠান আদালত। তারা আদালতে হাজির না হলে উভয়ের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন বিজ্ঞ আদালত। পরে চলতি মাসের ২১শে ফেব্রুয়ারী বুধবার রাতে কহিনুরকে আটক করে মোহনপুর থানা পুলিশ। ২২ ফেব্রুয়ারী বৃহস্পতিবার কহিনুরকে আদালতে চালান দেয়া হয়।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও থানা সুত্রে জানাগেছে, শামসুল আলম, তার জমি স্ত্রী কহিনুর বেগমের নামে জমি রেজিষ্ট্রি করিয়া দেন। এরপর ৩৭ শতক জমি স্বামী- স্ত্রী দু’জন মিলে গত ২০২১ সালে একই এলাকার সমতুল্লা খামারুর ছেলে আব্দুল জব্বারের কাছে দশ লাখ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে নগদ নয় লাখ টাকা বায়না নেন। সময়মত জমি রেজিষ্ট্রি করে দেয়াতো দূরের কথা শামসুল ও তার স্ত্রী জব্বারকে আঠারো মাস হয়রানীর পরে থানায় অভিযোগ হলে স্থানীয় শালিসদারদের মধ্যস্থতায় বায়নার টাকা ফেরত পায় আব্দুল জব্বার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ জানান, শামসুল ও তার স্ত্রী কহিনুর বেগম মারাত্মক প্রতারক। স্বামী স্ত্রী দু’জনে মিলে জমি বিক্রয়ের নামে সহজ সরল মানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছে। এবিষয়ে জমি ক্রেতা ভুক্তভোগী শফিকুল ইসলাম বলেন, তাঁর অনেক দিনের স্বপ্ন বেকারত্বদের কর্ম সংস্থান তৈরী করতে কেশরহাটের আশে পাশে একটা ফিড মিল তৈরী করবেন। এমন সময় ইসলামি ব্যাংক ম্যানেজার সিরাজুল ইসলাম তার গ্রাহক শামসুল আলমকে ঋনের দায় থেকে বাঁচাতে তাঁর নিকট বায়নামাকৃত জমির প্রকৃত তথ্য গোপন করে জমি কিনতে বলেন। ব্যাংক ম্যানেজারের কথার ফাঁদে পড়ে আস্থা ও বিশ্বস্ততার জায়গা তৈরী হয়। ব্যাংক ম্যানেজার শামসুল ও তার স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে ব্যাংকে বসে ৫১ শতক জমির দাম ৪৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করেন । তাতে তিনি রাজি হন।
গত ১৩ জুন ২৩ মোহনপুর সাব রেজিস্ট্রার অফিসে জমিটি বায়নামা রেজিষ্ট্রি করেন। এসময় ব্যাংক ম্যানেজার সিরাজুলের কথায় শামসুলের প্রতিষ্ঠান মিনহাজ কৃষি বিতান এর হিসাবে ১৫ লাখ টাকা জমা করতে বললে তিনি সেই টাকা জমা করে দেন। এরপর জমিতে কোন সমস্যা আছে কি না, সেটা জানতে বায়নামা রেজিষ্ট্রি করার পর পত্র পত্রিকায় আইনগত বিজ্ঞপ্তি প্রদান করেন তিনি। সব কিছু ঠিকঠাক চললেও বায়নামা রেজিষ্ট্রি মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। এ অবস্থায় কহিনুর বেগম, শামসুল ও ব্যাংক ম্যানেজার সিরাজুল ইসলাম জমি রেজিষ্ট্রি না দিয়ে কালক্ষেপন করে আসছে বলে জানান তিনি। এখন জমি ও টাকা কোন পাচ্ছেন না। জমির মালিক ও ব্যাংক ম্যানেজারের খপ্পরে পড়ে লাখ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁকে। তিনি প্রতারণার এর প্রতিকার চান।
এবিষয়ে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, কেশরহাট শাখা ব্যবস্থাপক সিরাজুল ইসলাম জানান, শফিকুল ইসলাম তাদের একজন ভাল গ্রাহক। তিনি এলাকায় একটি জমি কেনার ইচ্ছা পোষন করলে তাঁর শাখার শামসুল ইসলাম নামে এক ব্যাংক গ্রাহক জমি বিক্রি করতে এবং বায়নামা রেজিষ্ট্রি হয়। জমি বিক্রয় বায়নামা ১৫ লাখ টাকা ক্রেতা শফিকুল ইসলাম বিক্রেতা সামসুলের মিনহাজ কৃষি বিতানের হিসাবে টাকা জমা করেন। সবই ঠিক চলছিল কিন্তু শামসুল ও তার স্ত্রী কহিনুর ব্যাংকে আসছেনা। তার কোন খোঁজ পাচ্ছেন না। শফিকুল ইসলামও ব্যাংকে এসে এসে ঘুরে যাচ্ছেন। তারা ব্যাংকে না আসলে জমিটি রেজিষ্ট্রি করাও সম্ভব হচ্ছেনা বলে জানান তিনি।
এবিষয়ে মোহনপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হরিদাস মন্ডল জানান, জমি ক্রয় বিক্রয় সংক্রান্ত একটি সাধারণ ডায়রী প্রসিকিউশন কাটলে আদালত সেই ঘটনায় সামসুল ও কহিনুরের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি বুধবার পরোয়ানামুলে থানা পুলিশ কহিনুর বেগমকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। তাকে ২২ ফেব্রুয়ারি আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।