নিজস্ব প্রতিবেদক: বার বার শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানী করেও স্ব-পদে বহাল থাকছে এক শিক্ষক। এবার শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানী করে শ্রীঘরে গেছে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ধুরইল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোহরাব আলী খাঁন। ২০০৯ সালেও যৌন হয়রানির অভিযোগে তাকে জেলে যেতে হয়েছিলো বলে জানা গেছে। সে সময়ে তিনি বাকশিমইল উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক ছিলেন। তবে জেলা আওয়ামীলীগের ক্ষমতাধর নেতা হওয়ায় সে সময় তাকে সাময়িক বহিস্কার করা হয়নি।
আবার ২০২৩ সালেও তার বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ ওঠে। গত বছরের ২ অক্টোবর রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার ধুরইল উচ্চ বিদ্যালয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেনীর তিন ছাত্রীর সংগে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি অভিভাবকরা বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আক্কাস আলীকে জানালেও তিনি প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি। এ নিয়ে অত্র বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকগণ সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন। এই অভিযোগে প্রধান শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে উত্তম মধ্যম দেয় শিক্ষার্থীরা। সেইসাথে প্রধান শিক্ষকের অপসারণ চেয়ে স্কুল প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে বিক্ষোভও করে তারা। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত হন অভিভাবকরাও।
গত বছরের ১৫ অক্টোবর ২০২৩ রোববার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের হাতে অবরুদ্ধ থাকেন প্রধান শিক্ষক সোহরাব আলী খাঁন। খবর পেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেলা ১টার দিকে উপস্থিত হন স্থানীয় চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন, মোহনপুর থানা পুলিশ, সহকারী কমিশনার ভূমি মিথিলা দাস ও একাডেমিক সুপার ভাইজার আব্দুল মতিন। তাঁরা শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে অভিযুক্ত শিক্ষককে অপসারণসহ আটকের ঘোষনা দিলে বিক্ষোভ স্থগিত করেন শিক্ষার্থীরা । পুলিশ, প্রধান শিক্ষককে আটক করে থানায় নিয়ে যান। পরে এক ছাত্রীর অভিভাবক বাদি হয়ে থানায় মামলা দায়ের করলে সোহরাব আলীকে জেল হাজতে প্রেরণ করে মোহনপুর থানা পুলিশ।
এই মামলায় তিনি আদালত থেকে জামিন নেন। পরে থানা পুলিশ তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দিলে রাজশাহী নারী-শিশু আদালত (মোহনপুর) চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারী রোববার ওই শিক্ষকের জামিন বাতিল করে আবারো কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সেই থেকে জেল হাজতে রয়েছেন ওই প্রধান শিক্ষক।
ওই প্রধান শিক্ষক নানান অবকর্মের সাথে জড়িত। তিনি রাজশাহী জেলা আওয়ামীলীগের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি সাবেক মেম্বর আক্কাস আলীর একান্ত ঘনিষ্ঠ লোক হওয়ায় ঘটনার চার মাস অতিবাহিত হলেও জেলে থাকা অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে বরখাস্ত না করে তাকে বাঁচানোর সকল চেষ্টায় ব্যস্ত রয়েছেন সভাপতি আক্কাস আলী। এমনি অভিযোগ করেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অষ্টম শ্রেনীর এক ছাত্রী বলেন, প্রধান শিক্ষক সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে তার কোলে বসিয়ে ছবি তোলেন। বিভিন্ন সময়ে ছাত্রীদের স্পর্শকাতর অঙ্গ স্পর্শ করেন। বিভিন্ন ছাত্রীকে তার কক্ষে একা দেখা করতে বলেন। তার কথা না শুনলে তাকে ফেল করারও হুমকি দেন প্রধান শিক্ষক বলে জানান ওই ছাত্রী।
স্কুলটিতে দুই শত ষাট জন ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করে। প্রধান শিক্ষক সোহরাব আলী নানা সময় একাধিক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করেছেন বলে অভিযোগ তাদের। বিষয়গুলো স্কুলের সভাপতি, অন্যান্য শিক্ষক, কর্মচারী, এমনকি এলাকার লোকজনও জানেন বলেও উল্লেখ করেন ওই ছাত্রী। এছাড়াও সভাপতি প্রধান শিক্ষকের কথায় সভাপতি আক্কাস তার কথায় ওঠেন ও বসেন বলে জানা গেছে।
প্রধান শিক্ষক অবরুদ্ধের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এস এম মাহমুদ হাসান তদন্ত শেষে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে প্রধান শিক্ষক সোহরাব আলী খাঁন যৌন হয়রানির সাথে জড়িত এবং তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য সুপারিশ করেন।
উল্লেখ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাকশিমইল উচ্চ বিদ্যালয়ে কর্মরত কয়েকজন শিক্ষক জানান, সোহরাব আলী খাঁন ২০০৯ সালে বাকশিমইল উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক থাকাকালে নবম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির ঘটনায় একই সালের মার্চ মাসে ১০-১২দিন জেল হাজতে ছিলেন। বর্তমান মোহনপুর সরকারি কলেজ অধ্যক্ষ ও উপজেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক মফিজ উদ্দিন কবিরাজের সরাসরি হস্তক্ষেপে সে সময় তাকে বরখাস্ত করতে পারেনি উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তিনি তদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তন করে ওই ঘটনায় সোহরাব আলী খাঁনকে বাঁচিয়ে দেন বলেও জানান শিক্ষকরা।
এবিষয়ে ধুরইল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ জানান, সভাপতি ফোন করেছিলেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রধান শিক্ষককে সাময়িক বহিস্কার করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এ বিষয়ে মোহনপুর থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এস এম মাহমুদ হাসান জানান, তিনি ধুরইল উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তার কাছে এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। প্রধান শিক্ষককে বহিস্কার প্রসঙ্গে তিনি জানান, এবিষয়ে আমার কিছুই করার নাই। সবকিছুই সভাপতি করবেন।
এবিষয়ে মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আয়শা সিদ্দিকা বলেন, ধুরইল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোহরাব আলী খাঁনের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষে প্রতিবেদন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠানো হয়েছে।
এবিষয়ে জেলা শিক্ষা অফিসার নাসির উদ্দিন বলেন, যেহেতু প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে সেহেতু বিষয়টি আদালতের ব্যাপার। তাছাড়া এটা ম্যানেজিং কমিটি দেখবে বলে জানান তিনি।