মিজানুর রহমান, চেয়ারম্যান, সেভ দি ন্যাচার এ্যান্ড লাইভ:
নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন হলো কৃষি। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এখন অপরিহার্য। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের সেচ ব্যবস্থা জীবাশ্ম জ্বালানি বা ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। তবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় বর্তমানে সৌরশক্তিচালিত সেচ পাম্প এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ডিজেল চালিত পাম্পকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর কেবল পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং কৃষকের উৎপাদন খরচ কমিয়ে কৃষিকে লাভজনক করার এক অনন্য মাধ্যম।
বিএডিসির সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে সেচ মৌসুমে প্রায় ১৭ লাখ ১২ হাজার ৫১৫টি সেচযন্ত্র ব্যবহৃত হয়, যার মধ্যে বড় একটি অংশ (প্রায় ১২.৪৫ লাখ) ডিজেলচালিত।ডিজেল পাম্পগুলো বছরে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় ও বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ঘটায়। এছাড়া এই পাম্পগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া বায়ুমণ্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাড়িয়ে তুলছে।বাংলাদেশ গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশ হওয়ায় বছরের অধিকাংশ সময় পর্যাপ্ত সূর্যরশ্মি পাওয়া যায়।
বিশেষ করে বোরো মৌসুমে (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল) যখন সেচের চাহিদা তুঙ্গে, তখন প্রতিদিন গড়ে ১১-১২ ঘণ্টা সূর্যালোক পাওয়া যায়। এই সময়কে কাজে লাগিয়ে ফটোভোল্টিক (চঠ) পদ্ধতিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। আমাদেন সারফেস ওয়াটার কালেক্ট করার জন্য ছোট ছোট সোলার মডেল তৈরী করা যায় । যেগুলো খরচ ৫০ হাজার হতে ১ লক্ষ টাকা মধ্যে আর বড় পাম্পগুলোর জন্য ৮-১০ লক্ষ খরচ । ইতি মধ্যেই দেশে কিছু প্রতিষ্ঠান এই ধরনের কাজ করছে স্বল্প পরিসরে তাদের সহযোগিতা ও পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে । ফলে ডিজেলে দীর্ঘ দিন ধরে যে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে সেই টাকায় দিয়েই এই কাজটা করা সম্ভব ।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়: ১.৩৪ মিলিয়ন ডিজেল পাম্পকে সৌরশক্তিতে রূপান্তর করা গেলে বছরে প্রায় ৫০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের সমপরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব। সৌর পাম্প সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত। এটি কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সরাসরি ভূমিকা রাখছে। যদিও সৌর পাম্প স্থাপনের প্রাথমিক খরচ কিছুটা বেশি, তবে এর পরবর্তী পরিচালন খরচ নেই বললেই চলে। বিনামূল্যে পাওয়া সূর্যালোক ব্যবহার করে কৃষক দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী সেচ সুবিধা পায়।
আধুনিক সৌর সেচ প্রকল্পগুলো ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতিতে জাতীয় গ্রিডের সাথে যুক্ত হতে পারে। সেচ মৌসুমের বাইরে বা দিনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে মালিকরা বাড়তি আয় করতে পারেন, যা জাতীয় বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে সহায়ক।সৌর সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণে প্রধান বাধা হলো উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ এবং ভূগর্ভস্থ পানির অপচয়। অগভীর নলকূপের কমান্ড এরিয়া সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করায় পানির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে। এই সমস্যা উত্তরণে সরকারের গৃহীত ‘সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১৮’ কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপান্তর প্রক্রিয়াটি তিনটি ধাপে সম্পন্ন করা যেতে পারে: প্রথম ধাপ: বিদ্যুৎ সংযোগবিহীন প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাম্পগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সৌরশক্তিতে রূপান্তর। দ্বিতীয় ধাপ: ডিজেলচালিত গভীর নলকূপগুলোকে সৌর সেচ ব্যবস্থার আওতায় আনা। তৃতীয় ধাপ: বিধিমালা অনুযায়ী অতিরিক্ত ও অকার্যকর অগভীর নলকূপ অপসারণ করে এক-তৃতীয়াংশ দক্ষ সৌর পাম্প স্থাপন।
ডিজেলচালিত সেচ পাম্প থেকে সৌরশক্তিতে রূপান্তর কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং এটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তার চাবিকাঠি। সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা একটি জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি। সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থার এই পরিবর্তন কৃষিকে যেমন লাভজনক করবে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও সবুজ পৃথিবী নিশ্চিত করবে।বাংলাদেশের কৃষিকে টেকসই করতে হলে ১.৩৪ মিলিয়ন ডিজেল পাম্পের প্রতিস্থাপন এবং সৌর প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এটিই হবে স্মার্ট বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।