নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে জনসভায় যোগ দিয়ে আখচাষিদের মধ্যে প্রণোদনার অর্থ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার বিকেলে জনসভা থেকে ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষির জন্য মোট ১২ কোটি টাকা প্রণোদনা বরাদ্দের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলে ডিজিটাল বোতাম চেপে একযোগে প্রণোদনার অর্থ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সরকার প্রধান। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ সময় জনসভাস্থলে উপস্থিত হাজারো মানুষও সমস্বরে ‘বিসমিল্লাহ’ উচ্চারণ করেন।
এরপের তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, আজকে রাজশাহীতে আসার একটি উদ্দেশ্য আছে, সেটা হচ্ছে আখ চাষীদের মধ্যে সরকারের মধ্যে থেকে প্রণোদনার অর্থ প্রদান করা। যাতে আগামী মৌসুমে যেন আখ চাষ করতে কষ্ট কম হয়। কেন এই প্রণোদনা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে কৃষক ও কৃষি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তিনি বলেন, সাত মাস আগে তিনি এই রাজশাহীতে এসেছিলেন। সেই প্রতিটি নির্বাচনে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হলে কি কি করবেন। তার একটি ছিলো কৃষক ভাইদের পাশে দাঁড়াবে বিএনপি। তিনি আরো বলেছিলেন সরকার গঠনের কৃষি ঋণ মওকুফ করা হবে। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠনের মাত্র সাতদিনের মাথায় তিনি দশ হাজার টাকা কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, তের লক্ষ কৃষকের এই ঋণ মওকুফ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন নির্বাচিত হলে প্রতিটি কৃষককে একটিকৃষি কার্ড প্রদান করবেন। সেগুলোর দেয়া চলমান রয়েছে। ক্ষুদ্র কৃষক, প্রান্তিক কৃষক, ভূমিহীন কৃষক, মাঝারী কৃষক ও ধনী কৃষকসহ সকল কৃষকের তালিকা তৈরীর কাজ এগিয়ে চলছে। কিছুদিনের মধ্যে এর কাজ শেষ হবে। এই বছরের মধ্যে চল্লিশ লক্ষ ক্ষুদ্র কৃষক, প্রান্তিক কৃষক, ভূমিহীন কৃষক এর মধ্যে কৃষি কার্ড প্রদান করবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, এই কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা যদি বছরে দুই থেকে তিন ফসল উৎপাদন করতে পারে তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে একটি ফসল ফলানোর জন্য বীজ, সার ও কীটনাশন সম্পুর্ন বিনামূলে প্রদান করা হবে। এতে করে তাদের কষ্ট লাঘব হবে। এই কৃষি কার্ডের মাধ্যমে ব্যাংক ঋণও সহজে নিতে পারবেন। এই কার্ডের মাধ্যম্যে আবহাওয়াসহ দশটি সুবিধা পাবেন কৃষকরা। বিএনপি সরকার গঠন করলে কৃষকের পানির সমস্যা দুর করার কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন উত্তরাঞ্চল হচ্ছে কৃষি শস্য ভান্ডার। এখানকার কৃষকসহ সারাদেশের কৃষক ও জনগণ যেন সহজে পানি পায় সেজন্য দেশব্যাপি আবারও খাল খনন কর্মসূচী শুরু করবেন বলে জানান তিনি।
রাজশাহী মানুষ জানে এখানে কিভাবে পানির স্তর ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেছে। তাির আবার রিচার্জ হবে। এরজন্য পদ্মা ব্যারেজ করা হবে। তিনি বলেন, রাজশাহীর নেতৃবৃন্দ বলেছেন রাজশাহী মেডিকের কলেজ হাসপাতালের শস্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করার জন্য। তিনি এই হাসপাতালের শস্যা বৃদ্ধিসহ প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১৫০ শস্যায় উন্নীত করা হবে। শহীদ জিয়াউর রহমান করেছিলেন ৩০ শস্যা। বেগম জিয়া করেছিলেন পঞ্চাশ শস্যা। যাতে করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের জনগণ সহজে চিকিৎসা নিতে পারেন। সেখানে শিশু ও নারীদেও জন্য আলাদা বেড রাখবেন। সেইসাথে থাকবে আধুনিক ডায়ালসিস সেন্টার। ডায়ালসিস এর ওষুদেও মূল্য কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, গত বাজেটে হার্ট বাইপাস ও রিং পড়ানোর ইন্সট্রুমেন্টের উপর থেকে শুল্ক হ্রাস করায় এখন প্রায় অর্ধেক দামে তা নেমে এসেছে।
বিএনপি এটা করেছে। তিনি বলেন, আখ চাষীদের সহযোগিতা করার কথা বলেছিলেন। এই সহযোগিতার মাধ্যমে আখ চাষ শুরু হবে। এতে চিনি কল চালু হবে। শ্রমিকরা কাজ করবে। এরমধ্যে দেশে ছয়টি বন্ধ মিল কারখানা চালু করা হয়েছে।

আগামাী জানুযীর মাস থেকে শুরু করে ডিসেম্বর ২০২৭ সালের মধ্যে আরো ছিচল্লিশটি বন্ধ মিল কারকাখা চালু করার উদ্যোগ গ্রহন করেছেন বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, শ্রমিকরা যেন কাজ করে বেঁচে থাকতে পারে এর জন্য এই উদ্যোগ। সরকারের এই উন্নয়ন দেখে একটি দল দেশকে পিছু টানতে ষড়যন্ত্র করছেন। বিএনপি চাচ্ছে, কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব দূরীকরণ। এজন্য বন্ধ কলকারখানা চালু করতে কাজ করছে। আর একটি দলকে আরেকটি দলকে সাথে নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। তারা মিথ্যাচার করছে। নির্বাচনের সময় তারা টিকিট বিক্রিও করেছে। তা দেশবাসী জানে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি দেশী ও বিদেশী উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। অন্যদিকে ঐ একটি দল এই উন্নয়নকে থামিয়ে দিতে রাজপথে বিশৃখংলা করার চেষ্টা করছে।
তিনি আরো বলেন, দেশে প্রতিটি পরিবারের একজন নারীকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করার কাজ চলমান রয়েছে। এই ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে একটি দল নানা ধরনের অপপ্রচার চারিয়েছিলো। এক সময়ে বলেছিলো রাখ তোর ফ্যামিলি কার্ড। তিনি জনগণের নিকট প্রশ্ন করে বলেন, ফ্যামিলি কার্র্ড বন্ধ হলে কার ক্ষতি হবে। প্রতিটি নারীর ক্ষতি হবে। জনগণের ক্ষতি হবে। প্রতিটি পরিবারের ক্ষতি হবে। যিনি বলেছিলেন রাখ তোর ফ্যামিলি কার্ড তার কোন ক্ষতি হবেনা বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, এই ফ্যামিলি কার্ডের টাকা দিয়ে ঐ নারী তার সন্তানদের মুখ্যে একটু হলে পুষ্টিকরখাবার তুলে দিতে পারবে। সেইসাথে লেখাপড়াও করাতে পারবে। সর্বপরি তিনি সঞ্চয় করে ছোট আকারে একজন উদ্যোক্ত্যাও হতে পারবেন বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ঐ ষড়যন্ত্রকারী দল মূখে এক কথা বলে। কাজে করে আরেকটি। এখন জনগণ চায় গণতন্ত্র চর্চা, চায় কর্মসংস্থান। এ লক্ষেই বিএনপি কাজ করজে। এজন্য তিনি স্লোগান দিয়ে বলেন, করবো কাজ গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ। এরপর তিনি সবাইকে বিএনপির পাশে থাকার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।
উল্লেখ্য এর আগে বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে জনসভাস্থলে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে উপস্থিত বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা তাঁকে স্বাগত জানান। সেইসাথে তিনি মাঠে প্রবেশ করেই উপস্থিত প্রণোদমা গ্রহনকারীদের সাথে করমর্দন করেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে, জনসভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কীত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এডভোকেট শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ ও বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট সৈয়দ শাহীন শওকত।
রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের সঞ্চালনায় সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবা, নিপুর রায়, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট, বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও রাজশাহী জেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম মার্শাল, মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ মামুন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নজরুল হুদা, সহ-সভাপতি ওয়ালিউল হক রানা, মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম জনি, সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম রবি ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান জনিসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে দুপুর ২টা ৫৫ মিনিটে সামরিক বিমানে রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে জনসভাস্থলে যাওয়ার পথে সড়কের দুই ধারে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রীও বাসের ভেতর থেকে হাত নেড়ে তাঁদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।
জনসভা শেষে রাজশাহীর ধর্মসভা মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহন করেন। রাজশাহীর কর্মসূচি শেষে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন প্রধানমন্ত্রীর।
এর আগে শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী উপলক্ষে বুধবার সকাল ৯টায় রাজধানীর তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সামরিক বিমানে সৈয়দপুরের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি।সৈয়দপুর থেকে রংপুর যাওয়ার পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরে দুটি পথসভায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। পরে রংপুরের রাধাগোবিন্দ মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন তিনি।