নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় নিমঘুটু গ্রামে সেচের পানি না পেয়ে দুই আদিবাসী কৃষক আত্মহত্যার ঘটনায় সুষ্ঠু বিচার চায় তাদের পরিবার। এই দাবিতে শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজশাহীর কাজিহাটাস্থ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনজিও ফোরাম আঞ্চলিক কার্যালয়ে রক্ষাগোলা সমন্বয় কমিটির আয়োজনে এবংং সিসিবিভিও এর সহযোগিতায় সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিষপানে মারা যাওয়া দুই কৃষক পরিবার।
সংবাদ সম্মেলনে তাদের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হচ্ছে-অভিনাথ মার্ডি ও রবি মার্ডির আত্মহত্যায় প্ররোচণা দেওয়া সাখাওয়াত হোসেনের বিচারের মাধ্যমের শাস্তি নিশ্চিত করা, বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচ কার্যক্রমের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের জন্য বিএমডিএ কর্তৃপক্ষকে তদন্তের আওতায় এনে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা, বরেন্দ্র অঞ্চলে গভীর নলকূপ পরিচালনার ক্ষেত্রে কৃষকবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করা ও সুষ্ঠু তদারকির বিধান রাখা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে গভীর নলকূপ অপারেটর হিসেবে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিদের ও প্রন্তিক কৃষকদের পর্যাপ্ত পরিমাণে সেচের পানির অভিগম্যতার সুযোগ নিশ্চিতকল্পে নীতিমালায় সুস্পষ্ট বিধান করা।
এছাড়াও সংবাদ সম্মেলন থেকে তারা সাখাওয়াত হোসেন কর্তৃক নলকূপ ব্যবস্থাপনা ও সেচের ক্ষেত্রে সংঘটিত দূর্নীতি ও অনিয়মের আরো কিছু চিত্র তুলে ধরে বলেন,গভীর নলকূপের ট্রান্সমিটার পাহারা দেবার জন্য প্রতি মৌসুমে কৃষকদের কাছে থেকে জনপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা উত্তোলন করা হত যা খরচের কোন হিসেব নেই। চেম্বার মেরামতের জন্য কৃষকপ্রতি ৫০ টাকা উত্তোলন করা হতো। সেচের পানি প্রদানের ক্ষেত্রে কোন সিরিয়াল অনুসরণ করা হতো না; ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিদের ক্ষেত্রে সিরিয়াল থাকলেও ৮-১০দিন ঘোরানো হতো। নলকূপ অপারেটর স্কিমভুক্ত জমিতে নিজের পাওয়ার টিলার ছাড়া অন্য কোন পাওয়ার টিলার ব্যবহার করতে দিত না এবং বেশি চার্জ আদায় করতো। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিদের ক্ষেত্রে পানি না দেবার ভয় দেখিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে বাড়ির কাজ করিয়ে নিতো। সেচের পানির জন্য পীড়াপীড়ি করলে কৃষকদের বলতো, ‘তোদের পানি দেয়া হবে না, পারলে কেস কর গা’।
এছাড়াও ডীপ টিউবয়েলের কোন কিছু নষ্ট হলে ৫০০ টাকার খরচের জন্য কৃষকদের কাছে থেকে ৫০০০ টাকা আদায় করতো। আমাদের পানি উত্তোলনের কার্ড থাকলেও অপারেটর তার নিজের কার্ড ব্যবহারে বাধ্য করতো। বেশি টাকা আয়ের জন্য নির্ধারিত স্কিমের চেয়ে দ্বিগুণ জমিতে সেচ দিত। ডীপ অপারেটর নীতিমালার বাইরে জমি প্রতি টাকা ও ধান উত্তোলন করতো। ডীপ অপারেটরের মতের সাথে সম্মতি না দিলে সেচের পানি দেয় না। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি কৃষকদের ক্ষেত্রে গভীর রাত ছাড়া সেচের পানি প্রদান করে না। ডীপ অপারেটরের নিজস্ব আবাদী জমিতে জোরপূর্বক কম মজুরিতে কাজ করাতে বাধ্য করতো। আদিবাসীদের বর্গা চাষের জন্য ১০ বিঘা জমি থাকলে পানি না দেওয়ার হুমকি দিয়ে ২ বিঘা জমি জোর পূর্বক বর্গা চাষের জন্য কেড়ে নিত বলে উল্লেখ করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে তারা বিএমডি এর বরখাস্তকৃত গভীর নলকূপ অপারেটর সাখাওয়াতের দৃষ্টান্ত শাস্তি দাবি করে বলেন, গত ২৩ মার্চ বিকেলে গোদাগাড়ী উপজেলাধীন নিমঘুটু আদিবাসী পল্লীর অভিনাথ মার্ডি ও রবি মার্ডি ধানের জমিতে সেচের পানি না পেয়ে এবং বিএমডিএর নলকূপ অপারেটর সাখাওয়াত হোসেনের অসদাচারনের ফলে বিষপান করেন। ওই দিনই অভিনাথ মার্ডি মৃত্যুবরণ করেন। আর তার ভাই রবি মার্ডি ২৫ মার্চ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
ঘটনার পরে সাখাওয়াত হোসেনের নামে গোদাগাড়ী থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ অসহযোগিতা করে। পুলিশের অবহেলায় ২ দিন পর ২৫ মার্চ মামলা করতে হয়। সাখাওয়াত হোসেনের নামে দীর্ঘদিন ধরেই সেচের পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ থাকলেও এতদিন সেগুলোর কোনো তোয়াক্কায় করেন নি। খোদ কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তেও এই তথ্য উঠে এসেছে। বিএমডিএ কর্তৃক নির্ধারিত পানির দাম ১২৫ টাকা ঘণ্টার পানি ১৩৫ টাকায় কৃষকদের কাছে বিক্রি করতেন সাখাওয়াত। এই অনিয়ম বহুদিনব্যাপী চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো তদারকি ছিলো না বলেও এ সময় সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন- গোদাগাড়ীর আদিবাসী নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন- সিসিবিভিও গঠিত রাজশাহীর গোদাগাড়ী রক্ষাগোলা সমন্বয় কমিটির সদস্য আদিবাসী নেতা রঞ্জিত সাওরীয়া। উপস্থিত ছিলেন- মৃত কৃষক অভিনাথ মার্ডির স্ত্রী রোজিনা হেমব্রন, ও রবি মার্ডির ভাই সুশীল মার্ডি, রক্ষাগোলা সমন্বয় কমিটির উপদেষ্টা প্রসেন এক্কা, সভাপতি সরল এক্কা, সিসিবিভিওর সমন্বয়কারী আরিফ ও প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী নিরাবুল ইসলাম।